২০৪১ সালের মধ্যে দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সরকারের

Hasnat Nayem

০৪ মে ২০২১, ০৮:১৩


২০৪১ সালের মধ্যে দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সরকারের

পানি ও বায়ু পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছে, পরিবেশের এ উপাদানগুলো ততই দূষিত হচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে শব্দ দূষণও। এতে করে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনসমাজও।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, সারা বিশ্বে বছরে শুধুমাত্র বায়ু দূষণে আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। তবে এ ভয়াবহতা থেকে জনসমাজকে রক্ষায় সরকারের চিন্তাও কম নয়। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখছে, নিচ্ছে নানা পদক্ষেপও। জরিমানাও আদায় হচ্ছে মোটা অঙ্কের।

সরকারের লক্ষ্য, ২০৪১ সালের মধ্যে নতুন প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত বাসযোগ্য একটি সুস্থ, সুন্দর, টেকসই ও পরিবেশসম্মত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, এখনকার চেয়ে আগের পরিবেশ প্রাকৃতিক অবস্থায় ছিল। আমরা নিজেদের সম্পদ নিজেরা সঠিকভাবে যেন ব্যবহার করতে পারি, সেজন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ ধ্বংস করার কর্মকাণ্ডগুলোকে আইনগত বৈধতা দেওয়া প্রক্রিয়া চলছে।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিবেশ উন্নয়নে কাজের গতি বাড়াতে আরও লোকবল নিয়োগ করা হবে। জেলায় জেলায় তৈরি হবে পরিবেশের নতুন অফিস।

পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া কার্যক্রম
দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে সরকার ইতোমধ্যে বেশকিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নদীর পানির মান পরিবীক্ষণ করা। এ কার্যক্রমের আওতায় ২৭টি নদীর ৬৬টি স্থানে পানির গুণগত মান বর্তমানে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে আরও ৯৯টি স্থানের পানির গুণগত মান নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।

২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগারের ১ হাজার ৯৯৩টি শিল্প ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া এ সময় পর্যন্ত ৫৬৪টি তরল বর্জ্য নির্গমণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে জিরো ডিসচার্জ প্ল্যানের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। ৭২ দশমিক ৭৬ শতাংশ ইটভাটাকে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে ভবনের দেয়াল, সীমানা প্রাচীর, হেরিংবোন বন্ড রাস্তা এবং গ্রাম সড়ক টাইপ-বি এর ক্ষেত্রে ইটের বিকল্প হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০ ভাগ ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপনের বিষয়ে এস.আর.ও জারি করেছে এবং ওই বছর ১৩ জানুয়ারি ইটভাটা হতে নির্গমন ও নিঃস্বরণ মাত্রা পুনঃনির্ধারণপূর্বক এসআরও জারি করেছে সরকার।

অন্যদিকে হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক ঢাকা ও তার আশেপাশের জেলাগুলোর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত অবৈধভাবে পরিচালিত ৪৭১টি ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ ও ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ কোটি ৫৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছে।

এছাড়া যানবাহন হতে সৃষ্ট বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং কার্যক্রমের আওতায় সারাদেশে ১৬টি সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবিক্ষণ কেন্দ্র (CAMS) স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও ১৫টি কম্প্যাক্ট এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশন (Compact-CAMS) চালু করা হয়েছে। এ সব CAMS-এর মাধ্যমে দেশব্যাপী বায়ুর মান পরিবীক্ষণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সচিবালয়ের চারপাশের রাস্তাকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

এছাড়াও আগারগাঁও প্রশাসনিক এলাকা ও এর চতুর্দিক 'নীরব এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধি, ৬৪ জেলায় শব্দদূষণ মাত্রার বেইজলাইন তৈরি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী ৩টি বিভাগীয় শহরে শব্দদূষণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিষয়ক গবেষণা, শব্দের দূষণের মাত্রা পরিমাপ ও প্রদর্শনের জন্য পাইলটিং রিয়েল-টাইম মনিটরিং স্থাপন করার লক্ষ্যে 'শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন' শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
 
১০ বছরে জরিমানা আদায় প্রায় ১৯৩ কোটি টাকা
পরিবেশ দূষণ অপরাধে পরিবেশ অধিদফতর ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ হাজার ৫৭৭টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করেছে। আর এসব অভিযানে ৩৫০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করে ১৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আদায় করেছে সরকারের এ প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে পরিবেশ দূষণকারী ১ হাজার ৯২৪টি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে ২৭ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। ইতোমধ্যে সারাদেশে প্রায় ৬০০ অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যবহার রোধে ২০১৫ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত ২ হাজার ৯৮২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৮৩৬ দশমিক ১৪ টন পলিথিন শপিং ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে এবং ৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

অন্যদিকে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০১৫ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সময়ে ৫৮৬টি অভিযান পরিচালনা করে পরিবেশ আদালতে ৩১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা বাবদ মোট ৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।

এদিকে সরকারের পরিবেশ সংক্রান্ত আইন, নীতি ও কার্যক্রমগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে এবং পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকাণ্ড দেশব্যাপী সম্প্রসারণ ও অধিদফতরকে শক্তিশালী করার জন্য সরকার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিবেশ অধিদফতরের রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়সহ ৪৩টি জেলায় নতুন অফিস স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে।

বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি বিভাগীয়, আঞ্চলিক, মহানগর ও গবেষণাগার কার্যালয়সহ ৩৩টি জেলায় কার্যালয় স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অবশিষ্ট ৩১টি জেলায় শিগগিরই পরিবেশ অধিদফতরের কার্যালয় স্থাপন করা হবে। এছাড়া শিল্পঘন ১৮টি উপজেলায় পরিবেশ অধিদফতরের কার্যালয় স্থাপনের বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আইন, বিধিমালা, নীতিমালা প্রণয়ন ও হালনাগাদ
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশ সংবিধানে ১৮ক নামক একটি আলাদা অনুচ্ছেদ সংযোজন করে পরিবেশ সংরক্ষণকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ ব্যাপক সংশোধন করে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন ২০১০ জারি; পরিবেশ আদালত আইন ২০০০ বাতিল করে ব্যাপক পরিবর্তন করে পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ জারি; বিপদজনক ও জাহাজ ভাঙা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১ জারি; জীব নিরাপত্তা বিধিমালা ২০১২ জারি; ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ হালনাগাদ করে ২০১৯ সালে সংশোধিত আইন জারি; প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১৬ জারি এবং বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ জারি করা হয়েছে। জাতীয় পরিবেশ নীতি ১৯৯২ যুগোপযোগী করে জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং 'নির্মল বায়ু আইন ২০১৯' এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এতো অর্জন অনেকটা অদৃশ্য মন্তব্য করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের বন আর নদ-নদী কিংবা জলাশয় বলেন একসময় সব কিছুই প্রাকৃতিক অবস্থায় ছিল। কিন্তু সেটি এখন আর নেই। এদেশের মানুষের নিজের সম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করার মানসিকতায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু আজ ৫০ বছর পরেও আন্দোলন করে বলতে হয়, দেশের যে কোন নীতি, আইন বা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সবাইকে যুক্ত করা হোক। কারণ, এখনও মানুষকে সংযুক্ত করে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয় না। যতদিন পর্যন্ত মানুষের ক্ষমতায়ন সঠিকভাবে না হবে, ততদিন পর্যন্ত সম্পদের সঠিক ব্যবহার হবে না। পরিবেশ বিপর্যয় তলানিতেই থাকবে।’

এদিকে পরিবেশ উন্নয়নে আরও লোকবল প্রয়োজন জানিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের মন্ত্রণালয় দেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নে একটা অগ্রণী ভূমিকা রেখে যাবে। মানুষের কর্মকাণ্ডে পরিবেশের ক্ষতি হয়, এটা এখনও অনেক মানুষ বুঝেই না। মানুষকে সচেতন করাই আমাদের প্রধান কাজ। এখনও বাতাস, বায়ু, পানি দূষিত হচ্ছে। এ বিষয়গুলোতে মানুষকে সচেতন করতে হবে, এজন্য আমরা কাজ করছি। পরিবেশ অধিদফতরের প্রতি আমাদের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড প্রোগ্রাম আছে। বিশ্ব ব্যাংকসহ আরও অনেক দাতা সংস্থ্যা আমাদের দেশের পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের মাঠ প্রশাসনে এখনও লোকবল অভাব আছে। সেজন্য আমরা প্রথমে প্রতিটি জেলায় জেলায় একটি করে পরিবেশ অধিদফতরের অফিস করবো, সেখানে লোক নিয়োগ করবো। পরবর্তী সময়ে আমরা উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাব। এতে পরিবেশ উন্নয়নে কাজের গতি আমরা আরও বাড়াতে পারবো।'

পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, উন্নত দেশগুলোতে যেমন পরিবেশ হওয়ার কথা, বাংলাদেশেও তেমন পরিবেশ যেন হয় আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা মাটি, বায়ু, পানি যেন নষ্ট না হয়; বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ কল-কারখানাগুলো থেকে যেন দূষণমুক্ত থাকে, সেদিকে আমাদের নজর আছে। আমরা আশাকরছি, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত পরিবেশসম্মত একটি দেশে গড়তে পারবো।

এমএইচএন/এসএম

Link copied