আরেকটি শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র রূপ নিতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ও চরম বৈরী আবহাওয়া নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেমন হতো, যদি মানুষ সাময়িকভাবে সূর্যের আলো কিছুটা কমিয়ে দিয়ে এই প্রলয়ংকরী এল নিনোর তীব্র প্রভাবকে স্তিমিত করে দিতে পারত?
গত বুধবার বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় একদল বিজ্ঞানী ঠিক এই প্রশ্নটিরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
এল নিনো হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু বিন্যাস, যা সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং চরম বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টিতে ইন্ধন জোগায়। জলবায়ু পরিবর্তন একে আরও প্রকট করে তুলছে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এল নিনোর সময়গুলো দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে।
স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় খতিয়ে দেখা হয়েছে যে, ‘সোলার জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে পরিচিত একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট তীব্র দাবদাহ, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব কি না।
গবেষণায় মূলত ‘মেরিন ক্লাউড ব্রাইটেনিং’ বা সামুদ্রিক মেঘ উজ্জ্বলকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তিতে সমুদ্রের ওপর থাকা মেঘের স্তরে বিশেষ কণা স্প্রে করা হয়, যা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে আবার মহাকাশে ফিরিয়ে দেয় এবং পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, ‘ভয়াবহ এবং অপ্রত্যাশিত কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার’ আশঙ্কায় বাস্তবে এই জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির পরীক্ষা চালানো সম্ভব হয়নি। এর পরিবর্তে তারা একটি ‘প্রাকৃতিক ঘটনাকে’ পরীক্ষা হিসেবে বেছে নেন বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন।
২০১৯ ও ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ‘ব্ল্যাক সামার’ বা প্রলয়ংকরী বুশফায়ারে (দাবানল) লাখ লাখ একর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল এবং শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ওই দাবানল থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া তৈরি হয়েছিল, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে সক্ষম এমন কণা বহন করে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর থাকা মেঘের সঙ্গে মিশে যায়।
পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের আলো প্রতিফলনে সক্ষম এই মেঘগুলো সৌরশক্তির বড় একটি অংশ মহাকাশে ফিরিয়ে দিয়েছিল এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে ঠান্ডা করে তুলেছিল। এর ফলে পরবর্তীতে জলবায়ুর অপর রূপ ‘লা নিনা’র সৃষ্টি হয়, যা সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থেকে সৃষ্ট মেঘ উজ্জ্বলকরণের প্রভাবকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেন। এরপর তারা জলবায়ুর কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে অতীতে ঘটে যাওয়া দুটি শক্তিশালী এল নিনো (একটি ১৯৯৭ এবং অন্যটি ২০১৫ সালে শুরু হয়েছিল) ঘটনার ঠিক আগে একই ধরনের কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করে এর প্রভাব কেমন হতে পারে, তা পরীক্ষা করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট এলাকা লক্ষ্য করে চালানো ‘মেরিন ক্লাউড ব্রাইটেনিং’ প্রযুক্তি এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব দুর্বল করতে পারে এবং লা নিনার ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষণাটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, এল নিনো শুরু হওয়ার যত প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, এর কার্যকারিতা তত বেশি হবে।
জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং বা জলবায়ু প্রকৌশল একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি নিয়ে চিন্তা করাও চরম বিপজ্জনক, কারণ এর ফলে অগণিত এবং অপ্রত্যাশিত সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাদের আরেকটি বড় ভয় হলো, সম্ভাব্য ‘টার্মিনেশন শক’ বা চরম বিপর্যয় এড়াতে এই প্রযুক্তি একবার শুরু করলে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং চালু করার পর কোনো কারণে তা হুট করে বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা এক ধাক্কায় ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখানে যে বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন, তা একেবারেই ভিন্ন বলে জানিয়েছেন এই গবেষণার অন্যতম লেখক কেট রিক। তিনি স্ক্রিপস ওশানোগ্রাফি এবং ইউসি সান ডিয়েগোর স্কুল অব গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির একজন জলবায়ু বিজ্ঞানী। তার মতে, ধারণাটি হলো একটি নির্দিষ্ট মৌসুমী বা কয়েক বছর স্থায়ী বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ঘটনাকে লক্ষ্য করে সাময়িক হাতিয়ার হিসেবে জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করা, যা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি রুখতে নিশ্চিত কাজ করবে। তিনি বলেন, এটি এমন কোনো বিষয় নয় যাতে আপনি স্থায়ীভাবে আটকে যাচ্ছেন।
অবশ্য কেট রিক জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই গবেষণাপত্রে জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহারের পক্ষে কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি ধারণার সত্যতা যাচাই মাত্র... আমরা শুধু এটুকুই দেখিয়েছি যে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
গবেষকেরাও এর বেশ কিছু সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এল নিনো অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া; এর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হলেও, সব অঞ্চল কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিছু অঞ্চল এর প্রভাবের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়ায় এল নিনোর কারণে সাধারণত যে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তা বিপজ্জনক হলেও সেখানকার জলাধারগুলো পূর্ণ করতে এই বৃষ্টির ওপরই তাদের নির্ভর করতে হয়।
কেট রিক বলেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পরবর্তী লা নিনা ঘটনার সময়কাল, স্থায়িত্ব ও তীব্রতার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে এর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা বিস্তারিতভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এর লাভ-ক্ষতির দিকটি আমাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। জিও-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে তার সংযোজন, আপাতত কেবল ‘সুপার এল নিনো’র মতো পরিস্থিতির ক্ষেত্রেই এটি নিয়ে ভাবা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যেখানে প্রায় সব দেশ ও অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চরম ধ্বংসাত্মক ও বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে।
তবে এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেমস হেউড বলেন, সমুদ্রের মেঘ উজ্জ্বলকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানোর বিষয়টি কতটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য, তা নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন এবং অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তাপমাত্রা কমিয়ে আনার জন্য ঠিক কোন আকারের এবং কী পরিমাণ কণা তৈরি করতে হবে, তা নির্ধারণ করাই একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। তিনি আরও যোগ করেন, এর পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—যদি আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু করে ফেলি তখন কী হবে? মূলত এর মাধ্যমে তিনি একটি ‘মেগা লা নিনা’র আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন, যা আমাদের অতীতের যেকোনো অভিজ্ঞতার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী হতে পারে। উল্লেখ্য, লা নিনার কারণেও চরম বৈরী আবহাওয়া দেখা দিতে পারে; যার মধ্যে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক আবহাওয়া অন্যতম।
হেউড বলেন, ‘এই ধরনের প্রযুক্তি বাস্তবে ব্যবহার করা এবং এগুলো ঠিকঠাক কাজ করবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানার চেয়ে আমরা এখনও অনেক দূরে আছি।’
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড কিথও এর প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘গবেষণা শুরু হওয়ার প্রায় দুই দশক পার হয়ে গেলেও, সামুদ্রিক মেঘ উজ্জ্বলকরণের স্প্রেয়ারগুলোর কার্যক্ষমতা ব্যবহারিক প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অন্তত ১০০ গুণ কম।’ এই প্রযুক্তিটি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে বর্তমানে ‘এই প্রযুক্তিটির আসলে কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই।’
অধ্যাপক জেমস হেউড বলেন, প্রযুক্তিগত সমস্যার বাইরেও এখানে বড় ধরনের কিছু নৈতিক প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। যেমন—বিশ্ববাসী এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আসলে কার এবং জিও-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো সমাধান বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী দূষণ কমানোর মূল প্রচেষ্টা থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেবে কি না।
এই প্রশ্নগুলো বর্তমান গবেষণার আওতাভুক্ত না হলেও, কেট রিক স্বীকার করেছেন যে এই বিষয়ে আরও অনেক কাজ করার বাকি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরও অনেক কিছু বুঝতে হবে। তবে এল নিনোর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে যদি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকেই, তবে আমরা কেন তা বিবেচনা করব না?’
সূত্র : সিএনএন।
এনএফ
