আফগানিস্তানে তালেবানরা কী করছে? শুধু এটা নিয়ে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের ঘটনাবলি, বিশ্বের রাজনীতি প্রতি মুহূর্তে আমাদের দেশ ও দেশবাসীকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার ঘটনাবলির প্রভাব আরও বেশি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিবেচনা করে আমাদের এগোতে হয়। চলার পথের কৌশল নির্ধারণ করতে হয়।

আফগানিস্তানের ঘটনাবলি নিয়ে ইতিমধ্যে দেশের সর্বত্র আলোচনা চলছে। মূল ঘটনাবলির গভীরে বিশ্লেষণ করলে নতুন দিক পাওয়া যাবে। সাধারণভাবে একটু পেছনে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে নূর মুহাম্মদ তারাকি ও বারবাক কারমালের ক্ষমতা দখলের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা ও দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা ছিল।

শুধু ঐ সময় নয়, তার আগেও সোভিয়েত সহায়তা ছিল। এই শাসকদের উৎখাতে সক্রিয় ছিল দেশের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন শক্তি। ঐ সরকারকে উৎখাত করতে মার্কিন সরকারের সরাসরি মদদে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে জন্ম দেওয়া হয় আফগান মুজাহিদ বাহিনী। এদেরই আরেক রূপ আইএসএস, তালেবান ও আরও হরেক নামের বাহিনী। মার্কিনিদের পাশাপাশি পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ নানা শক্তির মদদ পায় এরা।

ইতিমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে যায়। ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিনিদের টনক নড়ে। এরপর এরা তাদেরই সৃষ্ট জঙ্গি দমনে সরাসরি অভিযানে নামে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আফগানিস্তান দখল করে নেয়।

ঘটনা যাই ঘটুক না কেন তালেবান বহাল থাকা মানে আফগানিস্তানে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের ঘাঁটি হবে যা দক্ষিণ এশিয়াকে এক বিরাট হুমকির মুখে ফেলবে।

এবার তালেবানদের বিনাযুদ্ধে আফগান দখল? শুধু কি তাই? নাকি তালেবানদের কাছে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তানকে তুলে দেওয়া?

সচেতন বিশ্ববাসীর কাছে এটা পরিষ্কার যে, ২০২০ সালে ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারে মার্কিন সরকার ও তালেবান নেতাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির ফলেই সব হলো শান্তিপূর্ণভাবে। ইতিপূর্বে এ চুক্তিকে চীন, পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়াসহ অনেক দেশ স্বাগত জানায়। এবার তালেবানরা আফগানিস্তান দখলের পর নানাভাবে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, ‘এই তালেবান সেই তালেবান না’।

ইতিমধ্যে তালেবানদের কর্মকাণ্ডে পরিষ্কার হচ্ছে এটা সেই তালেবানের নব সংস্কার ছাড়া নতুন কিছু না। ক্ষমতা দখল রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করছে মাত্র। 

দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আফগান জনগণ ইতিহাস ঐতিহ্যকে সামনে রেখে যে অর্জন করেছে সেই অর্জনের ফলে আগের মতো সবকিছু মেনে নেবে না। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন তালেবান বহাল থাকা মানে আফগানিস্তানে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের ঘাঁটি হবে যা দক্ষিণ এশিয়াকে এক বিরাট হুমকির মুখে ফেলবে। তালেবানদের বিভিন্ন দেশের প্রকান্তরে মেনে নেওয়া আরেকটা খারাপ নিদর্শন হয়ে থাকবে। এ তো গেল আফগানিস্তান নিয়ে সামান্য কথা।

আমাদের দেশে বিগত দিনে দেখা যায়, আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতায় আসার পর উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তি উজ্জীবিত হয়েছিল। এর আগে তালেবান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল অনেকে। এরা দেশে ফিরে স্লোগানও দিয়েছিল ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। এই জঙ্গিগোষ্ঠীর নানা অপকর্ম দেশবাসী দেখেছে।

বিভিন্ন এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, হোলি আর্টিজানে হামলা, উদীচী সম্মেলনে বোমা হামলা, রমনার বটমূলে হামলা, সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, একসাথে ৬৩ জেলায় হামলা, বিচারালয়ে হামলা ইত্যাদি দেশবাসী ভুলেনি। মাঝেমধ্যে এদের নানা গোষ্ঠীর অপতৎপরতার খবর জানা যায়। দেশের উপর চেপে বসা রোহিঙ্গাদের নিয়েও উগ্র গোষ্ঠীর অপতৎপরতার খবর শোনা যায়। 

এক সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বেড়ে উঠেছে। আবার ক্ষমতায় যেতে ও ক্ষমতায় থাকতে এদের সাথে চুক্তি করা, মদদ দেওয়া, এসব গোষ্ঠীকে খুশি করতে পাঠ্যপুস্তককে পরিবর্তন পর্যন্ত আনা হয়েছে। এখনো রাজনীতির হীন স্বার্থে এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। 

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত ২০০৫ সালে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতি’র ধারণা সামনে এনে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এরা নিজেরা এক অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এরা মানুষ হত্যা করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। নিজেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়া ও গণজাগরণে একাত্তরের ঘাতকরা কোণঠাসা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এরা রাজনৈতিক, সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। এর বিপরীতে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে সাথে নিয়ে বা ব্যবহার করে চলা ও এদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি হয়েছে।

দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রহীন পরিবেশে বসবাস করছে। জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেতে ‘নিজেকে’ টিকিয়ে রাখা বা ‘নিজেকে’ উপরে তুলে ধরাই যেন অনেকের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। প্রচলিত ধারার রাজনীতি এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারছে না।

চলতি ব্যবস্থার পরিবর্তনে বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল নিষ্ঠাবান শক্তি সফল না হওয়ায় মানুষ এখনো আস্থাভাজন বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না। এই পরিবেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি নানা মদদ পেয়ে এগোতে চাইছে। বর্তমান সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রদায়িক জঙ্গি দমন কার্যক্রমে এই অপশক্তি কোণঠাসা হলেও সাম্প্রতিক আফগানিস্তানের ঘটনায় এরা সাময়িক উজ্জীবিত হবে—এটাই স্বাভাবিক।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে এখনো উচ্ছেদ করা যায়নি। সর্বত্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেনি। এদের রাজনৈতিক মদদ দেওয়া বন্ধ হয়নি।

সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূল উচ্ছেদের জন্য পরিকল্পিত ভূমিকা নেই। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত ২০০৫ সালে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতি’র ধারণা সামনে এনে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এরা নিজেরা এক অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এরা মানুষ হত্যা করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। নিজেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সাথে যোগ দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে নিজেদের ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে। এদের ধারার শিক্ষাব্যবস্থার স্বীকৃতির মাধ্যমে এদের মতাদর্শের মানুষ তৈরি করছে। আত্মঘাতী নারী পর্যন্ত তৈরি করেছে।

আফগানিস্তানের সর্বশেষ ঘটনার পর আমাদের সামনে এই গোষ্ঠীকে রুখে দাঁড়াতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার কাজকে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্ধকারের অপশক্তিকে অনেক সময় প্রকাশ্যে সময় দেখা যায় না। এসব অপশক্তির গড়ে ওঠার পথ বন্ধ করতে গণতান্ত্রিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সেই পথের দিশা দিয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক নানা টানাপোড়নে মুক্তিযুদ্ধের পথকে সংহত করে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেই এই পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তালেবান ইস্যুতে বিশ্বের দেশগুলোর ভূমিকা হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিপদ মোকাবিলায় এসব অঞ্চলের জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে ভূমিকা নিতে হবে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স ।। সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)