এবারো ২০১৮ সালের মতো মিডনাইট নির্বাচন হলে জাতিকে মূল্য দিতে হবে

২০১৮ সালের মিডনাইট ইলেকশনের মতো যদি এবারও নির্বাচন হয় বা প্রত্যাশিত নির্বাচন হাতছাড়া হয়ে যায়, সেজন্য এ জাতিকে মূল্য দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি, এবার সেরকম পরিবেশ সৃষ্টি হবে না, হতে দেওয়া উচিত না। এটাকে যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে যে, এবার সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তিনি।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টায় জামায়াত আমিরের বসুন্ধরার কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে শেষ মুহূর্তে জামায়াতের নির্বাচন বয়কটের আশঙ্কা আছে কিনা? জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের প্রত্যেকটা ক্রেডিবল নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অংশ নিয়েছে। একটা নির্বাচনই আমরা বয়কট করেছি, সেটা ২০১৮ সালের নির্বাচন। যেটিকে মিডনাইট ইলেকশন বলা হয়ে থাকে। যখন আমাদের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে যে, এটা কোনো নির্বাচনই না, তখন দুপুর সাড়ে ১২টায় আমরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি, এবার সেরকম পরিবেশ সৃষ্টি হবে না, হতে দেওয়া উচিত না। এটাকে যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে যে, এবার সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। এবারের নির্বাচনও যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, আমরা জানি না, এ জাতিকে কতোটা মূল্য দিতে হবে।
তিনি বলেন, আজকের বৈঠকে সবার জন্য লেভের প্লেয়িং ফিল্ড আছে কিনা, কোনো সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ ও অভিযোগ আছে কিনা জানতে চাওয়া হয়েছে। আমরা বলেছি আছে। তবে আমরা এই মুহূর্তে এসব তাদের আগেই জানাতে চাচ্ছি না বলে জানিয়েছি। কারণ এসব সমাধান করা যাদের দায়িত্ব আগে তাদেরকে জানাবো। প্রধানত- নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশনকে অর্থবহ সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব। যদি এই দুই অথরিটিকে জানানোর পর সমাধান পেয়ে যাই তা হলে বাইরের কাউকে জানাবো না। যদি সমাধান না পাই তাহলে জনগণকে জানাবো। তখন আপনারাও (ইইউ) জানতে পারবে।
জামায়াত আমির বলেন, বৈঠকে তারা জানতে চাইছেন, যদি আগামীতে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করে তাহলে প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ কেমন হবে। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, বিশ্বের সভ্য, শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক, ভালো সম্পর্ক থাকবে। যারা আমাদের প্রতিবেশী তাদের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ থাকবে। আমরাও সেই প্রতিবেশীর কাছ থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করি।
আমরা বলেছি, নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের দিকে আমরা ঝুঁকতে চাই না। বরং সারা বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমন্বয় রক্ষা করে আমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাই।
জামায়াত আমির বলেন, যুবকরা বিশ্বাস করে, জামায়াতে ইসলামী যদি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় তাহলে সেটা রক্ষা করে। এই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এর রিফ্লেকশন হয়েছে। যুব শক্তির প্রতিফলন ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা মা-বোনদের নিরাপত্তা নিয়ে কনসার্ন। কারণ মা বোনেরাই আমাদের প্রথমত পছন্দ করছে। এর লক্ষণ আমরা এরইমধ্যে দেখছি। কিন্তু আমাদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া মা-বোনদের বাধা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি হিজাব খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, মা-বোন তো সবারই আছে। এসব কেন? রাজনৈতিক দলের কাজ হচ্ছে সব শ্রেণি, পেশার, লিঙ্গের মানুষকে সম্মান দেখানো। ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নিলে মায়েরাও নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেবে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে বাংলাদেশের জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে দেশকে নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসন কায়েমের জন্য। আমরা চেষ্টা করবো আমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্বের আমানতের বোঝা সঠিকভাবে বহন করার জন্য। জনগণ যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে আমরা দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। অন্যরা যদি অপজিশন গ্যালারিতে, বিরোধী দলে বসেন সেক্ষেত্রেও আমরা একইভাবে প্রত্যাশা করবো। এটা স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সমাজে স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চিন্তা করছি, নির্বাচন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষ বা রাজনৈতিক দল হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ভোগ করবে। তবে বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতার জায়গা থাকবে, সেখানে ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে।
গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেখে জনগণ হতাশ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ওই রাজনীতি আর মানুষ দেখতে চায় না, পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তনের জন্য মাসের পর মাস ঐক্যমত্য কমিশন বৈঠক করেছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে, যারা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বৈঠক থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শকে ধারণ ও গ্রহণ করতে হবে, প্রতিশ্রুতি দিতে হবে ক্ষমতায় গেলে এসব বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্কার বাস্তবায়ন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত ও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান যদি নিশ্চিত হয় তাহলে আমরা সব জায়গায়, সব ধরনের সহায়তা করতে আমরা প্রস্তুত।
তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, এখানকার ৮০ ভাগ কেউই জীবনে একটা ভোটও দিতে পারেন নাই। সুতরাং নিজের ভোট, তরুন সহযোদ্ধার ভোটও নিশ্চিত করবেন। জাতির সতর্ক পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামী নির্বাচনটা সুন্দর হতে সহযোগীতা করুন। আমরা সংস্কারের পক্ষে, অতএব আমরা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। আমরা জানি দেশবাসীও সংস্কার চায়, দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ, রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক, যাকেই ভোট দিন দেন, তবে সংস্কারের স্বার্থে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেবেন।
সম্প্রতি মূলধারার গণমাধ্যম একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এই প্রবণতা আমরা গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও দেখেছি, একটি পক্ষকে সেফ করার অবস্থানে ছিল। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় দলের প্রধান হিসেবে মন্তব্য জানতে চাইলে জামায়াত আমির বলেন, কতিপয় মূলধারার গণমাধ্যমের রোল একটি দলের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। ওই ঝোঁকে আর এখন বাংলাদেশে বড় কিছু হয় না, তেমনি আমরা তাদের কাছে এরকম কিছু প্রত্যাশা করি না। গণমাধ্যমের পজিশন গণমাধ্যম, এটা দলীয় মাধ্যম না, এটা মাথায় রেখে ফাংশন করুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ডাকসু নির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, গণমাধ্যমের কথাই যদি সব হতো তাহলে কোনো কোনো গণমাধ্যমের প্রকাশ্য একপেশে পক্ষপাতিত্ব আচরণ করেও সফল হয়নি। আমরা জনগণকে যথেষ্ট সচেতন, সতর্ক মনে করি না। আমরা জনগণকে মিসআন্ডারস্ট্যান্ড করি না। আমি বললেই জনগণ সেটা খেয়ে ফেলবে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। সুতরাং গণমাধ্যম তার নিজের অবস্থান নিজেকেই সংরক্ষণ করতে হবে। এটা চতুর্থ স্তম্ভ বলা হলেও আমার কাছে এটা দ্বিতীয় স্তম্ভ। কারণ সমাজকে দুটি দিক থেকে সমানভাবে দেখতে হয়, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের দিক থেকে। গণমাধ্যম হচ্ছে বিবেক। আমরা বিবেকের প্রতিফলনটা সাদাকে সাদা, কালাকে কালা বলার মতো হতে দেখতে চাই।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. যুবায়ের আহমেদ, উন্নয়ন টিম লিড দেওয়ান আলমগীর এবং জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান।
জেইউ/জেডএস