অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি অধ্যাদেশে বিপদে এভিয়েশন খাত

অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি করে জারি করা বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ বিপদে পড়েছে গোটা এভিয়েশন খাত। অধ্যাদেশে বিমানভাড়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা মুক্তবাজার অর্থনীতির মৌলিক নীতির পরিপন্থি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে বিপদে পড়বে দেশের অ্যাভিয়েশন খাত। সরকার যদি টিকিটের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়—যাকে প্রাইস সিলিং বলা হয়, তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এয়ারলাইনস খাতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং বহর সম্প্রসারণ ও নতুন রুট চালুর প্রবণতা কমে যাবে। পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাবে শেষ পর্যন্ত টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য উল্টো বেড়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১৭ সালের মূল আইনের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে প্রণীত এই অধ্যাদেশ গত ২ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় গেজেট আকারে প্রকাশ করে। সংশোধিত আইনে যাত্রীদের নিরাপত্তা, সুবিধা ও উপাত্ত সুরক্ষাকে কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস প্রোভাইডার, ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল ও সাধারণ বিক্রয় প্রতিনিধির (জিএসএ) সংজ্ঞা এবং কার্যাবলিও প্রথমবারের মতো আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অধ্যাদেশে বিমানভাড়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা মুক্তবাজার অর্থনীতির মৌলিক নীতির পরিপন্থি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন অধ্যাদেশে বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর কার্যক্রম নিয়েও বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো বিদেশি এয়ারলাইন বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাতে চাইলে তাকে নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন করতে হবে অথবা শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ বিক্রয় প্রতিনিধি (জিএসএ) হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো এয়ার অপারেটর সরাসরি ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা বা জিএসএ হিসেবে কাজ করতে পারবে না। সরকার বলছে, এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা কমবে। তবে এয়ারলাইনগুলোর মতে, এতে পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং ব্যবসায়িক নমনীয়তা কমে যাবে।
খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অধ্যাদেশ কার্যকর হলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভাড়া নিয়ন্ত্রণের কারণে নতুন রুট চালু ও বহর সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে, যা সরাসরি যাত্রীসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যাত্রীসেবা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও সরাসরি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে এবং দেশের বেসরকারি অ্যাভিয়েশন খাতকে সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিমান ভাড়া ও বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘উপদেষ্টা পর্ষদ’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই পর্ষদ দেশি ও বিদেশি এয়ার অপারেটর এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটরদের জন্য ফি, চার্জ, রয়্যালটি ও ভাড়ার হার নির্ধারণে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। এয়ার অপারেটরদের সব রুটের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়ার তালিকা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। কোনো রুটে কৃত্রিম সংকট বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে কম গুরুত্বপূর্ণ বা মার্জিনাল রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। এতে আকাশপথে সংযোগ কমে যাবে এবং যাত্রীসেবার মানও কমে যেতে পারে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বর্তমানে বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে এয়ারলাইনগুলোর পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এমনকি ২০১৩ সালের ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ওপেন স্কাই’ চুক্তিতেও ভাড়া নির্ধারণে বাণিজ্যিক স্বাধীনতার নীতি স্বীকৃত রয়েছে।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমান চলাচল অধ্যাদেশে ভাড়া নিয়ন্ত্রণে যে বিধান রাখা হয়েছে, তা মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতির পরিপন্থি এবং অ্যাভিয়েশন শিল্পের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির বিরোধী। বৈশ্বিকভাবে এয়ারলাইনসের ভাড়া নির্ধারিত হয় চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে। চাহিদা বাড়লে ভাড়া বাড়ে, আবার চাহিদা কমলে ভাড়া কমে যায়। অনেক সময় চাহিদা কম থাকলেও লোকসান দিয়ে ফ্লাইট চালু রাখতে হয় এয়ারলাইনসগুলোকে, যাতে বাজারে উপস্থিতি বজায় থাকে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সম্প্রতি বিমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে বৈশ্বিক বিমান সংস্থাগুলোর সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)। সংস্থাটি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে গত জানুয়ারিতে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, ধারা ৪৩এ-এর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থী। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সত্তরের দশকের শেষ দিকে অ্যাভিয়েশন খাতে নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবস্থা চালুর পর বিশ্বব্যাপী বিমান ভাড়া প্রকৃত অর্থে অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।
আইএটিএ সতর্ক করে বলেছে, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে যাত্রীদের পছন্দ সীমিত হবে, বিমান সংযোগ কমে যেতে পারে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংস্থাটি সরকারকে প্রস্তাবিত বিধানগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এয়ারলাইনগুলোর ভাড়া নির্ধারণের স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এ ধরনের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনায় বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর আগ্রহ কমে যেতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) এ বিষয়ে নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কাজী ওয়াহিদুল আলম আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভাড়া নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের বেসরকারি অ্যাভিয়েশন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এআর/এসএম