বিজ্ঞাপন

আকাশে ‘কস্ট ক্রাইসিস’ : যাত্রীর ঘাড়ে বাড়তি ভাড়ার বোঝা

অ+
অ-
আকাশে ‘কস্ট ক্রাইসিস’ : যাত্রীর ঘাড়ে বাড়তি ভাড়ার বোঝা

দেশের এভিয়েশন খাত নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। জেট ফুয়েলের (উড়োজাহাজের জ্বালানি) দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক— সব রুটেই ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে এয়ারলাইনগুলো। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে গন্তব্যভেদে ভাড়া বেড়েছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

গত ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জেট এ-১ জ্বালানির দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১১২.৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২.২৯ টাকা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে ১.৩২১৬ ডলারে উন্নীত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ঢাকা–কক্সবাজার ও ঢাকা–চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান ভাড়া ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তেলের এই আকাশচুম্বী দামের কারণে এয়ারলাইনগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের পকেটে

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ঢাকা–কক্সবাজার রুটে ভাড়া ১০-১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২ হাজার টাকায় ঠেকেছে। একইভাবে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে ৯-১০ হাজার টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে প্রায় ১১ হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

dhakapost
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক— সব রুটেই ভাড়া বাড়ছে হুহু করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রী এবং দেশের পর্যটন শিল্পের ওপর / ছবি- সংগৃহীত

উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা

বিজ্ঞাপন

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই জ্বালানি তেল খরচ। ফলে টিকে থাকতে হলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প নেই। তাত্ত্বিকভাবে রুটভেদে মূল ভাড়া ১৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে, প্রতিযোগিতার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে এই বৃদ্ধির হার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ভাড়ার প্রভাব পড়বে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রুটে। ঢাকা–জেদ্দা, রিয়াদ, দুবাই ও কুয়েতসহ প্রবাসীকর্মী নির্ভর রুটগুলোতে ভাড়া ৬৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এছাড়া ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুর রুটে যাওয়া-আসার ভাড়া ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এভিয়েশন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের ফলে অভ্যন্তরীণ রুটের এয়ারলাইনগুলো চরম চাপে পড়বে। আগে যেখানে কম যাত্রী নিয়েও ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব ছিল, এখন থেকে পর্যাপ্ত যাত্রী (লোড) ছাড়া তা আর টেকসই হবে না। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক রুটে বিদেশি এয়ারলাইনগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। তারা বিদেশ থেকে কম খরচে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে, আবার টিকিটের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফাও অর্জন করতে পারবে। এতে করে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।’

জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রুটে বিমান ভাড়া ৬৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি এয়ারলাইনগুলো নিজ দেশ থেকে কম দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারায় তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। এতে দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং টিকিট বিক্রির বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে

‘একই সঙ্গে কার্গো বা পণ্য পরিবহন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিবহন খরচ বাড়লে আমদানি-রপ্তানি করা পণ্যের দাম বাড়বে, যা বাজারে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করবে।’

তিনি মনে করেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধি হঠাৎ না করে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। এতে যাত্রী, এয়ারলাইন এবং পর্যটন ও হোটেলের মতো সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাপ সামলানোর সুযোগ পেত। এভিয়েশন খাতের সংকটের প্রভাব সম্মিলিতভাবে পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে।’

dhakapost
পর্যটন খাত স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কায় বুকিং বাতিল হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সাধারণ যাত্রীদের এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে? / ছবি- সংগৃহীত

ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ

এদিকে, এভিয়েশন ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি) জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হাবে জেট ফুয়েলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে বাংলাদেশের এয়ারলাইনগুলো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কলকাতায় প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ০.৬২ ডলার, মাস্কাটে ০.৬০৩, দুবাইয়ে ০.৫৮৭, দোহায় ০.৫৮৪, সিঙ্গাপুরে ০.৫৮৬ এবং জেদ্দায় ০.৫৮১ ডলার। ব্যাংককে দাম কিছুটা বেশি (১.০৯৮ ডলার) হলেও তা বাংলাদেশের বর্তমান দরের চেয়ে অনেক কম।

এওএবি মহাসচিব ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক এবং বিপর্যয়কর। এটি পুনর্বিবেচনা করা না হলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’ 

dhakapost
জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা / ছবি- সংগৃহীত 

স্থবির পর্যটন খাত

জ্বালানির দাম বাড়ায় পর্যটন খাতও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যমুখী যাত্রী কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ট্যুর অপারেটর, হোটেল ও সংশ্লিষ্ট সেবাখাতগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বুকিং কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি দেশের পর্যটন খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জেট ফুয়েলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এয়ারলাইনগুলোর পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে; যার ফলে এয়ারফেয়ার (বিমান ভাড়া) ও ট্যুর প্যাকেজের খরচও আকাশচুম্বী হচ্ছে। এতে সাধারণ পর্যটকদের মাঝে ভ্রমণের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক চাপ, ব্যবসায়িক মন্দা এবং অনুকূল পরিবেশের অভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনও এখন স্থবির। এমনকি আসন্ন ঈদের মতো দীর্ঘ ছুটিতেও পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত সমাগম দেখা যাচ্ছে না, যা এই খাতের গভীর সংকটকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।’

এআর/এমএআর/