বিজ্ঞাপন

অব্যবহৃত বিমানবন্দর : ঘুমিয়ে থাকা সম্পদ, জাগ্রত অর্থনীতির সম্ভাবনা

অব্যবহৃত বিমানবন্দর : ঘুমিয়ে থাকা সম্পদ, জাগ্রত অর্থনীতির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আলোচনায় সড়ক, রেল ও নৌপথ নিয়ে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, আকাশপথ নিয়ে ততটা বিস্তৃত পরিকল্পনা অনেক সময় দেখা যায় না। অথচ একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এভিয়েশন খাত শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন কিছু বিমানবন্দর রয়েছে, যেগুলো একসময় কার্যকর থাকলেও বর্তমানে সীমিত বা প্রায় অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এসব অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত বিমানবন্দরকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা গেলে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।

বিমানবন্দর মূলত একটি অঞ্চলের প্রবেশদ্বার। যেখানে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত হয়, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এর ফলে শুধু অবকাঠামোগত চাপই বাড়ছে না, বরং অন্যান্য অঞ্চলের সম্ভাবনাও যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

যদি যশোর, বরিশাল, রাজশাহী, সৈয়দপুর বিমানবন্দরগুলো আধুনিকায়ন ও কার্যকর করা যায়, তাহলে রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনীতির ভারসাম্য কমবে এবং অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

সিলেট বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে যদি উন্নয়ন প্রকল্প করা যায় তবে বৃহত্তর সিলেটের গণমানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দীপশিখা জ্বলে উঠবে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতির চাকা আরও অধিকতর সচল থাকবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত হবে। দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, লালমনিরহাট, শমশেরনগর মতো অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো দীর্ঘসময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে অথবা বেসামরিক জনগণের জন্য কোনো উপকার বয়ে আনছে না। বর্তমান সরকার অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো চালু করার জন্য নানাভাবে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। স্বল্পতম সময়ে বিমানবন্দরগুলো পরিচালনের আওতায় আনা গেলে দেশের আকাশপথ আরও বেশি সুদৃঢ় হবে। দেশের সার্বিক অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে।

পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিমানবন্দরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিকভাবে দেখা যায়, যে অঞ্চলে সহজ বিমান যোগাযোগ রয়েছে, সেখানে পর্যটক প্রবাহ বেশি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও পর্যটন শিল্প এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

কক্সবাজার, সিলেট বা পার্বত্য অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলোয় বিমান যোগাযোগ সহজ হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। পর্যটক বাড়লে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

বিমানবন্দর সচল হওয়ার আরেকটি বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হলো বিনিয়োগ আকর্ষণ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন অঞ্চল বেছে নেন, যেখানে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে। একটি কার্যকর বিমানবন্দর কোনো অঞ্চলের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানিমুখী কারখানার জন্য আকাশপথের সংযোগ একটি বড় সুবিধা। যদি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক লজিস্টিক হাব, কার্গো টার্মিনাল ও গুদামজাত সুবিধা গড়ে তোলা যায়, তাহলে দ্রুত পণ্য পরিবহন নিশ্চিত হবে। এতে কৃষিপণ্য, মাছ, ফুল, ফার্মাসিউটিক্যালস কিংবা তৈরি পোশাকের মতো সময়-সংবেদনশীল পণ্যের রপ্তানি সহজ হবে।

বাংলাদেশ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে সমৃদ্ধ হলেও কৃষিপণ্যের দ্রুত পরিবহনের সীমাবদ্ধতায় অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চলের সবজি, ফলমূল, দুগ্ধজাত পণ্য বা মৎস্য খাতের পণ্য দ্রুত বিমানযোগে দেশের বড় শহর বা বিদেশে পাঠানো গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা ভালো মূল্য পাবেন। ফলে কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

কর্মসংস্থানের দিক থেকেও বিমানবন্দর একটি বড় অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। একটি বিমানবন্দর চালু মানেই শুধু বিমান ওঠানামা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কার্গো, ক্যাটারিং, পরিবহন, ট্রাভেল এজেন্সি, খুচরা ব্যবসা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাত। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী নতুন আয়ের সুযোগ পায় এবং জীবনমান উন্নত হয়।

অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক বিমানবন্দর সচল থাকলে দ্রুত ত্রাণ, উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণেও এসব বিমানবন্দরের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সম্ভাবনা থাকলেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। শুধু রানওয়ে থাকলেই একটি বিমানবন্দর কার্যকর হয় না। প্রয়োজন আধুনিক ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা, টার্মিনাল সুবিধা, নিরাপত্তা অবকাঠামো, কার্গো সুবিধা, দক্ষ জনবল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাণিজ্যিকভাবে টেকসই যাত্রী ও কার্গো চাহিদা।

 সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে বিমানবন্দরগুলো কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি এয়ারলাইন্সগুলো নতুন রুট চালু করতে প্রণোদনা, জ্বালানিতে সহায়তা ও কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো বাংলাদেশের জন্য কেবল অবকাঠামোগত সম্পদ নয়; এগুলো সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা পেলে আঞ্চলিক অর্থনীতির নতুন কেন্দ্র হতে পারে। একটি সচল বিমানবন্দর একটি অঞ্চলকে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। তাই অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনর্জাগরণ করা মানে শুধু আকাশপথ সচল করা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়া।

রাষ্ট্রের প্রতিটি অবকাঠামোই একটি বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য তখনই আসে, যখন তা জনগণ ও অর্থনীতির জন্য কার্যকর হয়। অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো তাই অলস সম্পদ হিসেবে ফেলে না রেখে উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশ যখন আঞ্চলিক সংযোগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, তখন অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো হতে পারে নতুন সম্ভাবনার রানওয়ে। সঠিক নীতি, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন থাকলে এই বিমানবন্দরগুলোই দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

দেশের অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো কেবল এক একটি অবকাঠামো নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত। অব্যবহৃত বিমানবন্দর রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয় সম্পদ নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ঘুমিয়ে থাকা অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এগুলো বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশে ‘মাল্টি-সিটি ইকোনমি’ তৈরি হবে, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট

বিজ্ঞাপন