বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় এখন আর বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার অবকাঠামো নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
উন্নত বিশ্বে বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক হাব, হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স এবং রপ্তানিকেন্দ্রিক শিল্প। ফলে বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি এখন জাতীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত ধারণা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কারণ বাংলাদেশ মূলত রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি, যেখানে তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যের দ্রুত পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় বিমানবন্দর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।
একটি আধুনিক বিমানবন্দর দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অপরিহার্য। বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতের নমুনা পাঠানো, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, তাজা ফুল, ফলমূল কিংবা জরুরি পণ্য পরিবহনে বিমানবন্দর অপরিহার্য।
উন্নত কার্গো ব্যবস্থাপনা থাকলে রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত হয়, ব্যবসায়িক ব্যয় কমে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (হশাআবি) দীর্ঘদিন ধরেই দেশের প্রধান এয়ার কার্গো গেটওয়ে হিসেবে কাজ করছে।
বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতির আরেকটি বড় দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু বিমান সংস্থা বা এভিয়েশন খাতেই চাকরি সৃষ্টি করে না; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয় বহু সহায়ক খাত।
পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার, নিরাপত্তা কর্মী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ, কার্গো অপারেটর, ক্যাটারিং, ক্লিনিং, আইটি সাপোর্ট—সব মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এর বাইরে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন ও পর্যটন খাতেও কর্মসংস্থান বাড়ে। ফলে বিমানবন্দর একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করে তোলে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশেও বিমানবন্দরের ভূমিকা অপরিসীম। একটি দেশের প্রথম পরিচয় তৈরি হয় বিমানবন্দরের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, সহজ ইমিগ্রেশন, ভালো ট্রানজিট সুবিধা এবং উন্নত যাত্রীসেবা বিদেশি পর্যটকদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দেয়।
বাংলাদেশে কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে কক্সবাজারকে বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। একইভাবে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রবাসী যাত্রী ও আঞ্চলিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন দেশ ও অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেয় যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত, দ্রুত ব্যবসায়িক যাতায়াত সম্ভব এবং পণ্য পরিবহনে সময় কম লাগে।
বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে যদি ফ্রি ট্রেড জোন, লজিস্টিক পার্ক, ওয়্যারহাউসিং, কনফারেন্স সুবিধা এবং শিল্পপার্ক গড়ে তোলা যায়, তাহলে তা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে। উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যে এই মডেল অনুসরণ করে ব্যাপক অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে।
বিশ্বে এখন ‘বিমানবন্দরভিত্তিক নগরায়ন’ ধারণা বেশ জনপ্রিয়। অর্থাৎ বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নগর অর্থনীতি গড়ে তোলা। এই ধারণায় বিমানবন্দরের আশেপাশে গড়ে ওঠে আবাসন, বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও বিনোদন অবকাঠামো।
এর ফলে জমির মূল্য বৃদ্ধি পায়, অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটে এবং নতুন ব্যবসা সৃষ্টি হয়। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-কে কেন্দ্র করে দুবাইয়ের অর্থনৈতিক বিস্তার কিংবা সিঙ্গাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দর-কে কেন্দ্র করে সিঙ্গাপুরের লজিস্টিক শক্তি এর সফল উদাহরণ।
সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ল্যান্ডিং ফি, পার্কিং চার্জ, যাত্রীসেবা ফি, কার্গো চার্জ, কনসেশন ফি, ডিউটি-ফ্রি ব্যবসা, ট্যাক্স ও ভ্যাট থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারে। বিমানবন্দরকে যদি বাণিজ্যিকভাবে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজস্বের বড় উৎসে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী, দ্রুত বর্ধনশীল পর্যটন খাত, গার্মেন্টস রপ্তানি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান এই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েছে।
তবে সম্ভাবনা বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ অপারেশনাল খরচ, কার্গো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নীতিগত জটিলতা, দক্ষ জনবল সংকট এবং মাল্টিমোডাল যোগাযোগের অভাব।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, আধুনিক কার্গো টার্মিনাল, বেসরকারি বিনিয়োগ, এমআরও সুবিধা, ফ্রি ট্রেড জোন এবং সড়ক-রেল-সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক কার্গো হাব এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
দেশের বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ইতিমধ্যে দেশের অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো সচল করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর পরিচালন যোগ্য হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
সেই সঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনকেন্দ্রিক যে ধোঁয়াশা ছিল তা কাটিয়ে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সম্ভাব্য উদ্বোধনের ঘোষণা ইতিমধ্যে দিয়েছেন বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, যা দেশের আকাশ পরিবহনে আমূল পরিবর্তন আশা করছে। ফলে জিডিপি’তে ভূমিকা রাখবে বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি।
পরিশেষে বলা যায়, বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি শুধু এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিকে বহুমাত্রিকভাবে গতিশীল করার একটি কার্যকর মাধ্যম।
সঠিক পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে বিমানবন্দর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
