বিজ্ঞাপন

আকাশপথের ভাড়া : শুধু দূরত্ব নয়, জটিল অর্থনীতির হিসাব

আকাশপথের ভাড়া : শুধু দূরত্ব নয়, জটিল অর্থনীতির হিসাব

সাধারণ যাত্রীরা প্রায়ই একটি প্রশ্ন করেন, একই গন্তব্যে একই ফ্লাইটের টিকিট একেকজন একেক দামে কেন কিনছেন? কেউ কয়েক সপ্তাহ আগে কম দামে টিকিট পান, আবার কেউ একই ফ্লাইটের জন্য দ্বিগুণ বা তারও বেশি মূল্য পরিশোধ করেন।

অনেকের ধারণা, বিমানের ভাড়া নির্ধারণ কেবল দূরত্বের ওপর নির্ভরশীল। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এত সরল নয়। এয়ারলাইন্সের ভাড়া নির্ধারণ একটি জটিল বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অর্থনৈতিক কৌশল, যেখানে বাজার বিশ্লেষণ, পরিচালন ব্যয়, প্রতিযোগিতা, যাত্রী প্রবণতা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সমন্বিতভাবে কাজ করে।

এয়ারলাইন্স ভাড়া নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় চাহিদা ও সরবরাহকে। কোনো রুটে যাত্রীর চাহিদা যত বেশি, ভাড়া তত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ঈদ, গ্রীষ্মকালীন ছুটি, হলিডে, হজ-ওমরাহ মৌসুম কিংবা বছরের শেষভাগের উৎসব মৌসুমে টিকিটের মূল্য বেড়ে যায়।

কারণ এই সময় যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং এয়ারলাইন্সগুলো তাদের আসন থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব অর্জনের চেষ্টা করে। বিপরীতে, অফ-সিজনে বা যাত্রী কম থাকলে এয়ারলাইন্স বিভিন্ন অফার ও ডিসকাউন্ট দেয়।

রুটের প্রকৃতি ও যাত্রী প্রবাহ ভাড়া নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। সব রুট সমানভাবে লাভজনক নয়। কিছু রুটে ব্যবসায়িক যাত্রী বেশি, কিছু রুটে প্রবাসী শ্রমবাজার নির্ভর যাত্রী, আবার কিছু রুট পর্যটননির্ভর।

যেমন দুবাই, দোহা বা রিয়াদ রুটে প্রবাসী যাত্রী বেশি থাকায় এসব রুটের ভাড়া নিরূপণ প্রক্রিয়া আলাদা। অন্যদিকে ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর রুটে ব্যবসায়ী ও পর্যটননির্ভর যাত্রী উভয়ের উপস্থিতি থাকায় ভাড়ার কাঠামোও ভিন্ন হয়।

পরিচালন ব্যয় ভাড়া নির্ধারণের মূল ভিত্তিগুলোর একটি। একটি ফ্লাইট পরিচালনার পেছনে রয়েছে বিপুল ব্যয়—জেট ফুয়েল, বিমানবন্দর চার্জ, নেভিগেশন ফি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কেবিন ক্রু, মেইনটেন্যান্স, ক্যাটারিং, নিরাপত্তা এবং বিমানের লিজ খরচ।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরভেদে চার্জও ভিন্ন হয়। যেমন লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরের পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি, ফলে টিকিটের দামও সাধারণত বেশি হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জ্বালানি মূল্য।

এভিয়েশন শিল্পে জেট ফুয়েল অপারেশনাল ব্যয়ের অন্যতম বড় অংশ। অপারেশন ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশের অধিক জেট ফুয়েল খরচ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে এয়ারলাইন্সগুলো ফুয়েল সারচার্জ বাড়াতে বাধ্য হয়।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট জেট ফুয়েলের দামে প্রভাব ফেলে, যা সরাসরি টিকিটের মূল্যে প্রতিফলিত হয়।

প্রতিযোগিতা এয়ারলাইন্সের ভাড়া নির্ধারণের আরেকটি বড় নিয়ামক। একই রুটে যত বেশি এয়ারলাইন্স পরিচালনা করে, ভাড়া নির্ধারণে প্রতিযোগিতা তত বাড়ে। ফলে প্রোমোশনাল ফেয়ার এবং স্পেশাল অফার দেখা যায়। কিন্তু কোনো রুটে যদি প্রতিযোগিতা কম থাকে বা একক ফ্লাইট থাকে, তাহলে ভাড়া তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

এয়ারলাইন্সগুলো রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে, যা বুকিং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে ভাড়া সমন্বয় করে। যে যাত্রী অনেক আগে টিকিট কেনেন, তিনি সাধারণত কম দামে টিকিট পান। কারণ এয়ারলাইন আগেভাগে ইনভেন্টরি সেল করতে চায়।

অন্যদিকে লাস্ট মিনিট ট্রাভেলারদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে উচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এ কারণেই একই ফ্লাইটে একই আসনের দাম সময়ভেদে ভিন্ন হয়।

এছাড়া সিজন বা মৌসুমি প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ছুটির সময়, উৎসব, বড় ক্রীড়া আয়োজন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা পর্যটন মৌসুমে ডিমান্ড বেড়ে যায়। বিপরীতে অফ-সিজনে কম দামে টিকিট দেয়।

কোন এয়ারক্রাফট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও ভাড়া নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বোয়িং ৭৭৭ বা এয়ারবাস এ৩৩০-এর মতো ওয়াইড-বডি এয়ারক্রাফট পরিচালনা ব্যয়বহুল হলেও বেশি যাত্রী বহন করতে পারে। অন্যদিকে ন্যারো-বডি এয়ারক্রাফট যেমন বোয়িং ৭৩৭ বা এয়ারবাস-এ ৩২০ শর্টহল রুটে বেশি ব্যবহৃত হয়।

বর্তমান লো-কস্ট এয়ারলাইন মডেল-এ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনসিলারি রেভিনিউ বা আনুষঙ্গিক আয়। অনেক এয়ারলাইন বেসফেয়ার কম রাখে, কিন্তু ব্যাগেজ ফি, সিট নির্ধারণ, খাবার, প্রায়োরিটি বোর্ডিং, ডেট চেঞ্জ ফি ইত্যাদি থেকে অতিরিক্ত আয় করে। ফলে বিজ্ঞাপনে কম ভাড়া দেখা গেলেও টোটাল ট্রিপ কস্ট তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক রুটে মুদ্রা বিনিময় হার, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের মূল্য, টিকিট মূল্যে প্রভাব ফেলে। কারণ এয়ারক্রাফট লিজ, ফুয়েল পেমেন্ট, ইনস্যুরেন্স, মেইনটেন্যান্স ইত্যাদিতে অনেক ব্যয়ই ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ফলে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এয়ারলাইনের খরচ বাড়ায়।

সবশেষে, কিছু রুট সরাসরি লাভের জন্য অপারেট করা হয় না; বরং নেটওয়ার্ক কানেকটিভিটি-এর অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। বড় এয়ারপোর্ট হাব যেমন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কানেকটিং প্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন্য কিছু কম দূরত্বে কম ভাড়ায় পরিচালনা করা।

অতএব, এয়ারলাইন্সের ভাড়া নির্ধারণ কেবল দূরত্বের সরল গাণিতিক হিসাব নয়; বরং এটি বাজার বিশ্লেষণ, ব্যয় কাঠামো, যাত্রী আচরণ, প্রযুক্তিনির্ভর রেভিনিউ ফোরকাস্টিং এবং প্রতিযোগিতামূলক কৌশলের সমন্বিত ফল।

একটি দেশের এভিয়েশন খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু নতুন রুট চালু করাই যথেষ্ট নয়; এয়ারলাইন অর্থনীতি, ফুয়েল প্রাইসিং, এয়ারপোর্ট চার্জ এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ আকাশপথে প্রতিটি টিকিটের দামের পেছনে রয়েছে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক সমীকরণ।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট