বিজ্ঞাপন

শাহজালালে স্বাধীন রানওয়ে : সম্ভাবনার আকাশে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন

শাহজালালে স্বাধীন রানওয়ে : সম্ভাবনার আকাশে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন

বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, ততই বাড়ছে আকাশপথের গুরুত্ব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, প্রবাসী যোগাযোগ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সংযোগ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এখন বিমান পরিবহন। আর এই পুরো ব্যবস্থার প্রধান প্রবেশদ্বার হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

তৃতীয় টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে দেশের এভিয়েশন খাতে নতুন যুগের সূচনা হলেও একটি প্রশ্ন এখন ক্রমেই সামনে আসছে—শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কি আরেকটি স্বাধীন বা ইন্ডিপেনডেন্ট রানওয়ে নির্মাণ সম্ভব?

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ইন্ডিপেনডেন্ট রানওয়ে চালু হলে বিমান ওঠানামার সক্ষমতা বা ‘এয়ার ট্রাফিক ক্যাপাসিটি’ বহুগুণ বেড়ে যাবে। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দর মূলত একটি রানওয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় একই সময়ে একাধিক ফ্লাইট পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ও ফ্লাইটের চাপ আরও বাড়বে।

ইন্ডিপেনডেন্ট রানওয়ে বলতে বোঝায়—দুটি সমান্তরাল রানওয়ে এমন দূরত্বে নির্মিত হবে যাতে একটি রানওয়েতে বিমান অবতরণ বা টেকঅফ চলাকালে অন্য রানওয়েটিও একই সময়ে স্বাধীনভাবে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ এক রানওয়েতে বিমান নামছে, অন্য রানওয়েতে একই সময়ে আরেকটি বিমান উড়ে যাচ্ছে। এতে রানওয়ে ‘ওয়েটিং টাইম’ অনেক কমে যায়।

প্রশ্নটি নিছক অবকাঠামোগত নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ আধুনিক বিশ্বের বড় বিমানবন্দরগুলো কেবল যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবাহের কেন্দ্র।

সিঙ্গাপুর, দুবাই, দোহা কিংবা দিল্লির মতো বিমানবন্দরগুলো বহুমাত্রিক রানওয়ে ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট অর্থনীতির শক্তিশালী হাবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শাহজালাল বিমানবন্দর এখনো মূলত একটি রানওয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে বিমানবন্দরে একটি বিমান অবতরণ করলে আরেকটি বিমানকে অপেক্ষা করতে হয়। ব্যস্ত সময়ে ঢাকার আকাশে একাধিক বিমানকে ঘুরতে দেখা যায় রানওয়ে ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায়। এতে সময় নষ্ট হয়, জ্বালানি অপচয় হয় এবং এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ে।

একইসঙ্গে যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় স্বাধীন রানওয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বর্তমানে যদি ঘণ্টায় ৩৫-৪০টি মুভমেন্ট সম্ভব হয়, তাহলে স্বাধীন সমান্তরাল রানওয়ে থাকলে তা ৬০-৮০ মুভমেন্ট পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে—যদি এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও ট্যাক্সিওয়ে অবকাঠামো আধুনিক হয়। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন।

কারণ একটি স্বাধীন সমান্তরাল রানওয়ে নির্মাণ মানে শুধু আরেকটি রানওয়ে বানানো নয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুযায়ী দুটি রানওয়ের মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব থাকতে হয়, যাতে একই সময়ে স্বাধীনভাবে বিমান ওঠানামা করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে বিশাল নিরাপত্তা এলাকা, ট্যাক্সিওয়ে, এপ্রোন, অবতরণ যন্ত্রপাতি এবং এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ, কার্যত একটি নতুন পূর্ণাঙ্গ বিমান অপারেশন করিডোর তৈরি করতে হয়।

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ধারণক্ষমতা ২০-২৪ মিলিয়নের বেশি হতে পারে। কিন্তু ‘বড় টার্মিনাল’ মানেই ‘বেশি ফ্লাইট’ নয়। ফ্লাইট পরিচালনার মূল সীমাবদ্ধতা হলো রানওয়ে। তাই ইন্ডিপেনডেন্ট রানওয়ে হলে, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, ট্রানজিট ফ্লাইট, কার্গো অপারেশন, মধ্যরাতের স্লট বৃদ্ধি -সবই সহজ হবে।

এখানেই সবচেয়ে বড় বাধা—জমি। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাজধানী ঢাকার অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। চারপাশে উত্তরা, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, বাউনিয়াসহ বিস্তৃত আবাসিক এলাকা, সড়ক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। নতুন রানওয়ে নির্মাণ করতে গেলে ব্যাপক ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হবে। এতে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, নগর কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে এবং ব্যয় পৌঁছাতে পারে কয়েক হাজার কোটি টাকায়। রাজধানীর মতো ব্যয়বহুল নগর এলাকায় এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ নয়।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সামরিক ও বেসামরিক ব্যবস্থাপনার জটিলতা। শাহজালাল বিমানবন্দর শুধু বেসামরিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র নয়; এর সঙ্গে বিমানবাহিনীর কার্যক্রমও সম্পৃক্ত। ফলে নতুন রানওয়ে নির্মাণ মানে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং নিরাপত্তা ও আকাশসীমা ব্যবস্থাপনার বড় পুনর্বিন্যাস। একই আকাশপথে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, সামরিক উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার পরিচালনা করতে হলে অত্যন্ত আধুনিক ও সমন্বিত এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দরকার হবে।

দুটি ইন্ডিপেনডেন্ট রানওয়ে নির্মিত হলে কার্গো ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে। ফলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস, দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য রপ্তানির জন্য দ্রুত এয়ার কার্গো গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যাত্রীবাহী ফ্লাইটের চাপের কারণে কার্গো অপারেশন বাধাগ্রস্ত হয়। দুটি স্বাধীন রানওয়ে থাকলে আলাদা কার্গো স্লট, রাতভিত্তিক ফ্রেইটার অপারেশন, দ্রুত রপ্তানি সম্ভব হবে।

পর্যটন খাতের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ এখন কক্সবাজার, সিলেট, সুন্দরবন কিংবা পার্বত্যাঞ্চলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি সীমিত থাকলে পর্যটন বিকাশের গতি কমে যায়। অধিক ফ্লাইট ও উন্নত সময়সূচি বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশকে আরও সহজলভ্য করে তুলবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি নতুন স্বাধীন রানওয়ে নির্মাণে শুধু রানওয়ে নয়, বরং ট্যাক্সিওয়ে, আধুনিক রাডার, আইএলএস (ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম), এয়ারফিল্ড লাইটিং, ড্রেনেজ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং উন্নত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল প্রযুক্তি স্থাপন করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এই বিপুল বিনিয়োগ শাহজালালে করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার বাইরে নতুন আন্তর্জাতিক মেগা হাব নির্মাণ করবে?

অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, রাজধানীকেন্দ্রিক এভিয়েশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক হাবে রূপান্তর করা জরুরি।

একইসঙ্গে ঢাকার বাইরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক মেগা এয়ারপোর্ট নির্মাণের ভাবনাও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ বিশ্বের অনেক বড় শহরই কেন্দ্রীয় নগর এলাকার বাইরে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পথ বেছে নিয়েছে।

তবে এটাও সত্য যে, বর্তমান রানওয়ের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ এখনো রয়েছে। আধুনিক র‌্যাপিড এক্সিট টেক্সিওয়ে, উন্নত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, ডিজিটাল স্লট ম্যানেজমেন্ট এবং দ্রুত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমান অবকাঠামো থেকেই আরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব। অর্থাৎ, শুধু নতুন রানওয়ে নয়; দক্ষ ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শাহজালালে স্বাধীন রানওয়ের আলোচনা তাই কেবল একটি প্রকল্পের আলোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আকাশ অর্থনীতির রূপরেখা নির্ধারণের প্রশ্ন। আগামী দুই দশকে দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ যেভাবে বাড়বে, তাতে বর্তমান সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নাও হতে পারে। এখনই যদি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আকাশপথের চাপ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বাধায় পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এই সম্ভাবনাকে টেকসই শক্তিতে রূপ দিতে হলে আধুনিক, পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি এভিয়েশন অবকাঠামো নির্মাণের বিকল্প নেই। শাহজালালে স্বাধীন রানওয়ে বাস্তবায়ন হোক বা বিকল্প মেগা হাব নির্মাণ—এখন সময় বাস্তবতাকে সামনে রেখে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ ভবিষ্যতের অর্থনীতির বড় অংশই নির্ভর করবে দেশের আকাশপথ কতটা কার্যকর, দ্রুত ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে তার ওপর।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরও একটি ইন্ডিপেনডেন্ট রানওয়ে চালু হলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

এটি শুধু বেশি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগই তৈরি করবে না, বরং সময়ানুবর্তিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্প্রসারণ, কার্গো রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন উন্নয়ন এবং ‘এয়ারপোর্টভিত্তিক অর্থনীতি’ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থাৎ, আরও একটি স্বাধীন রানওয়ে কেবল অবকাঠামো নয়—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আকাশ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশ এখন শুধু একটি ভোক্তা অর্থনীতি নয়; এটি দ্রুত আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটন ও যোগাযোগের কেন্দ্র হওয়ার পথে এগোচ্ছে। সেই যাত্রায় একটি স্বাধীন রানওয়ে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়—এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক।

সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী বিনিয়োগের মাধ্যমে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত হতে পারে। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে—আরও একটি কার্যকর স্বাধীন রানওয়ে।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট