দীর্ঘ ৭৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী পাইলট তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি অ্যান্ড জেনারেল এভিয়েশন লিমিটেড’-এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
চলতি বছরের ২৬ জুন একাডেমি কর্তৃপক্ষ এক চিঠিতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) জানায়, প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনার মতো ফান্ড না থাকায় তারা প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে চায়। এরপর ২৮ জুনের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য সামনে আসে।
আরও পড়ুন
১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা বেবিচক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স (পিপিএল), কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল), ইনস্ট্রুমেন্ট রেটিং (আইআর), ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর রেটিং (এফআই) এবং ফরেন লাইসেন্স কনভারশনের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল।
প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় সাড়ে ছয়শত কমার্শিয়াল পাইলট, সাড়ে তিন শতাধিক প্রাইভেট পাইলট এবং অর্ধশতাধিক ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টরসহ হাজারো পাইলট দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে সফলভাবে কাজ করছেন। এমনকি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত পাইলটদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এছাড়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ারে কর্মরত বহু পাইলটও এই একাডেমি থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

বেবিচক সূত্র জানায়, বন্ধ হওয়ার পেছনে প্রতিষ্ঠানটি চরম ‘সংকটের’ কথা জানিয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কাছে বর্তমানে একাডেমির একটি সেসনা বিমান রয়েছে, তবে সেটির প্রপেলারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন প্রপেলার আনা হলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেটি এখনো সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখতে নতুন দুটি সেসনা বিমান আনতে হবে। এতে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার বেশি খরচ হবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে এগুলো কেনা সম্ভব নয়।
প্রতিষ্ঠানটি বেবিচককে জানিয়েছে, সরকার যেখানে বড় বড় উন্নয়নমূলক কাজ করছে, সেখানে মাত্র ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেই এই ঐতিহ্যবাহী একাডেমিকে পুনরায় সচল করা সম্ভব।

ফ্লাইং একাডেমি সংশ্লিষ্ট একজন ঢাকা পোস্টকে জানান, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির একটি সেসনা-১৫২ মডেলের প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। ওই দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী তামান্না রহমান রিধী নিহত হন। এরপর রাজশাহীতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। সেসনার দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য ঘটনার তদন্তেও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।
অনিশ্চয়তায় ১০ পাইলট শিক্ষার্থীর জীবন
হঠাৎ ফ্লাইং একাডেমি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী এখন শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে সেখানে ১০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন। তাদের শিক্ষাবর্ষের প্রায় ২ কোটি টাকা একাডেমিতে আটকে আছে।

এদিকে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে এমনিতেই পাইলটের সংকট রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ হয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি একটি ক্লাব ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের আগে সংশ্লিষ্টদের কোনো সভা বা এক্সট্রা-অর্ডিনারি জেনারেল মিটিং (ইজিএম) হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাই পুরো বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা দরকার।
তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় এক হাজার পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে ফ্লাইট পরিচালনা করছেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের জন্য বড় ক্ষতি। দেশে যখন পাইলটের সংকট রয়েছে, তখন প্রতিষ্ঠানটি কেন বন্ধ হয়ে যাবে, সেটি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও সরকারের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।
এআর/এমএসএ
