বিজ্ঞাপন

এয়ারলাইন থেকে এভিয়েশন গ্রুপ ইউএস-বাংলার নতুন স্বপ্ন

বাংলাদেশের এভিয়েশনের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

বাংলাদেশের এভিয়েশনের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

এয়ারক্রাফট এখন আর কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষকে পৌঁছে দেওয়ার বাহন নয়। আধুনিক বিশ্বে এভিয়েশন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম-যেখানে যাত্রী পরিবহন, কার্গো, পর্যটন, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড সার্ভিস, ক্যাটারিং, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, হসপিটালিটি এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, ইউএস-বাংলা কি শুধু এয়ারলাইন ব্যবসা করবে, নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন গ্রুপ গড়ে তুলবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বর্তমান সম্প্রসারণ পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি ২১টি নতুন বোয়িং এর মধ্যে—১৫টি বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এনজি-২০২৭ সালের মধ্যে বহরে যুক্ত করার প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে বহরে যুক্ত হবে।

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে একটি সমন্বিত এভিয়েশন গ্রুপে রূপান্তরের লক্ষ্য প্রকাশ করেছে। বর্তমানে ২৫টি এয়ারক্রাফটের সাথে ২১টি এয়ারক্রাফট যুক্ত করা, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানবহরকে সমৃদ্ধি করে; অন্যদিকে ইউএস-বাংলা এভিয়েশন গ্রুপ তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার একটি ব্যবসায়িক রূপান্তর।

এয়ারলাইন থেকে এভিয়েশন গ্রুপ

একটি এয়ারলাইন্সের মূল ব্যবসা হলো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। কিন্তু এভিয়েশন গ্রুপ-এর ধারণা হলো—বিমান পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যতগুলো মূল্যসংযোজনকারী ব্যবসা রয়েছে, সেগুলো একটি ইকোসিস্টেম-এর মধ্য নিয়ে আসা।

এই কাঠামোর কেন্দ্রে থাকতে পারে একটি ফুল সার্ভিস ক্যারিয়ার। এর পাশাপাশি বাজারের ভিন্ন শ্রেণির যাত্রীদের জন্য লো-কস্ট ক্যারিয়ার বা আলাদা দ্বিতীয় এয়ারলাইন প্রতিষ্ঠার ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউএস-বাংলা ইতিমধ্যে দ্বিতীয় এয়ারলাইন এবং ফুল সার্ভিস ও লো-কস্ট ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

এখানে শুধু অন্য এয়ারলাইন্সের সাথে প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া নয়, লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগীকে শুধু হারানো নয়; বরং যাত্রীর সম্পূর্ণ ভ্রমণকে নিজের ইকোসিস্টেম-এর মধ্যে নিয়ে আসা। একজন যাত্রী টিকিট কিনবেন অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বা নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে।

বিমানবন্দরে যাবেন নিজস্ব গ্রাউন্ড সার্ভিস-এর মাধ্যমে। উড়বেন নিজস্ব এয়ারলাইন-এ। খাবার পাবেন-নিজস্ব ক্যাটারিং থেকে। গন্তব্যে পৌঁছে হোটেল, যাতায়াত ও হলিডে প্যাকেজ পাবেন-নিজস্ব পর্যটন শাখার মাধ্যমে। ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন হলে কার্গো বা ফ্রেইটার সার্ভিস ব্যবহার করবেন। আর সেই বিমানের মেইনটেন্যান্স, ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল জনশক্তি ও তৈরি হতে পারে একই গ্রুপ-এর আওতায়। এটাই এভিয়েশন গ্রুপ-এর প্রকৃত শক্তি।

ফুল সার্ভিস ও লো-কস্ট ক্যারিয়ার-দুই বাজার, দুই কৌশল

বাংলাদেশের আকাশ পরিবহনে ফুল সার্ভিসের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী লো-কস্ট ক্যারিয়ার-এর শূন্যতা রয়েছে। সব যাত্রীর প্রয়োজন এক নয়। এক শ্রেণির যাত্রী চান ব্যাগেজ এলাউন্স, খাবার, সংযোগ, লাউঞ্জ, নমনীয়তা এবং প্রিমিয়াম পরিষেবা। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক যাত্রীর প্রধান বিবেচনা হলো-কম ভাড়া, সময়মতো ফ্লাইট এবং প্রয়োজনমাফিক অতিরিক্ত সেবা কেনার সুযোগ।

সুতরাং একই গ্রুপ-এর অধীনে দুটি আলাদা ব্যবসায়িক মডেল থাকলে বাজারের দুই কৌশলকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। তবে লো-কস্ট ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা মানেই শুধু কম ভাড়া নয়। এর জন্য আলাদা ব্যয় কাঠামো, বিমানবহর-সংক্রান্ত দর্শন, টার্নঅ্যারাউন্ড কৌশল, ডিজিটাল বিতরণ ব্যবস্থা, আনুষঙ্গিক আয় এবং পরিচালন কৌশল প্রয়োজন।

প্যাসেঞ্জার এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কার্গো এয়ারলাইন্স

বাংলাদেশের এভিয়েশন অর্থনীতির আরেকটি বিশাল সম্ভাবনা হলো এয়ার কার্গো। গার্মেন্টস, ওষুধপত্র, সামুদ্রিক খাদ্য, পচনশীল পণ্য, উচ্চমূল্যের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, ই-কমার্স পণ্য -সব ক্ষেত্রেই দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য আকাশ পরিবহন ভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন বাড়ছে। তাই একটি এভিয়েশন গ্রুপ-এর মধ্যে সুনির্ধারিত কার্গো এয়ারলাইন বা ফ্রেইটার অপারেশন তৈরি করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউএস-বাংলার ঘোষিত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সুনির্ধারিত কার্গো এয়ারলাইন বা ফ্রেইটার অপারেশন-এর পাশাপাশি এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স, ট্রেইনিং এবং ফ্লাইট ক্যাটারিং এর ব্যবসার কথাও এসেছে। এখানে একটি বড় সম্ভাবনা হলো বেলি কার্গো, ফ্রেইটার ও লজিস্টিকস-এই তিন স্তরকে একসঙ্গে তৈরি করা।

কোল্ড চেইন: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুযোগ

কার্গো মানেই শুধু সাধারণ পণ্য নয়। বাংলাদেশের জন্য কোল্ড চেইন এভিয়েশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, সামুদ্রিক খাবার, ওষুধপত্র, টিকা এবং তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজন তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত গুদাম, হিমায়িত ট্রাক, শীতল কক্ষ, পণ্য টার্মিনাল এবং বিশেষ হ্যান্ডলিং পদ্ধতি।

অর্থাৎ বিমানবন্দরের পাশে একটি সমন্বিত কার্গো ও কোল্ড চেইন হাব তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ শুধু প্যাসেঞ্জার হাব নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি লজিস্টিক হাব হওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। ইউএস-বাংলার সম্প্রসারণ পরিকল্পনাতেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে রিজিওনাল হাব হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এভিয়েশন একাডেমি: বিমান কেনার পাশাপাশি প্রফেশনাল কর্মী তৈরি

বিমান কেনা যায় কিন্তু দক্ষ এভিয়েশন প্রফেশনাল স্বল্পতম সময়ে তৈরি করা যায় না। একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন গ্রুপ-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হতে পারে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন একাডেমি। এর আওতায় থাকতে পারে—পাইলট ট্রেইনিং, কেবিন ক্রু একাডেমি, গ্রাউন্ড সার্ভিস ট্রেইনিং, এভিয়েশন সিকিউরিটি, রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট, রিজার্ভেশন সিস্টেম, এভিয়েশন প্রকিউরমেন্ট, অপারেশনস ম্যানেজমেন্ট, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্ট, কার্গো ম্যানেজমেন্ট, ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টসহ এভিয়েশনের নানাবিধ বিষয়।

বাংলাদেশে এভিয়েশন জনশক্তির বড় অংশ এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে বিদেশি ট্রেইনিং ইকোসিস্টেম-এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একাডেমি গড়ে উঠলে এটি শুধু নিজস্ব কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে না; ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষার্থীদেরও আকর্ষণ করতে পারে। এখান থেকে একটি নতুন এভিয়েশন এডুকেশন এক্সপোর্ট খাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমি, সিমুলেটর ও এমআরও

এয়ারক্রাফট পরিচালনার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো মেইনটেন্যান্স। একটি এভিয়েশন গ্রুপ যদি দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব এমআরও-মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার এবং ওভারহোল সক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তাহলে এটি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, এয়ারক্রাফট গ্রাউন্ডেড থাকার সময় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয়-ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমি, সিমুলেটর সেন্টার, টেকনিক্যাল ট্রেইনিং এবং এমআরও। তাহলে একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন টেকনিক্যাল ইকোসিস্টেম তৈরি হবে।

একজন ট্রেইনি আজ সিমুলেটর-এ প্রশিক্ষণ নেবে, কাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করবে, পরে এমআরও-তে আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট-এর মেইনটেন্যান্স করবে। অর্থাৎ ট্রেইনি থেকে এমপ্লয়মেন্ট, এমপ্লয়মেন্ট থেকে সেবা প্রদান—একটি সম্পূর্ণ মূল্যবান চেইন তৈরি হবে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও ইনফ্লাইট ক্যাটারিং

একটি বিমানের যাত্রা শুধু ককপিট থেকে পরিচালিত হয় না। এয়ারক্রাফট এর মুভমেন্ট-এর প্রতিটি মিনিট অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং-এর মধ্যে রয়েছে যাত্রী ব্যবস্থাপনা, ব্যাগেজ, র‍্যাম্প কার্যক্রম, উড়োজাহাজ পরিষ্কার, পুশব্যাক, লোডিং-আনলোডিং এবং টার্নঅ্যারাউন্ড সমন্বয়।

একইভাবে ইনফ্লাইট ক্যাটারিং নিজেই একটি বড় ব্যবসা। নিজস্ব ক্যাটারিং সুবিধা থাকলে এয়ারলাইন-এর প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সকেও ক্যাটারিং সার্ভিস দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ একটি সার্ভিস যা আজ খরচের কেন্দ্র, সেটিই আগামী দিনে আয়ের কেন্দ্র হতে পারে।

ওটিএ ও ডিজিটাল এভিয়েশন

আগামী দিনের বিমান ব্যবসা শুধু সেলস কাউন্টার বা ট্রাভেল এজেন্ট-নির্ভর থাকবে না। অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ডায়নামিক প্যাকেজিং, হোটেল বুকিং, বিমানবন্দর যাতায়াত সুবিধা (এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার), ইনস্যুরেন্স, ট্যুর, গাড়ি ভাড়া—সবকিছুকে একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম এর মধ্যে আনা সম্ভব।

উদাহরণস্বরূপ যাত্রী শুধু ঢাকা-ব্যাংকক টিকেট কিনবেন না; একই প্লাটফর্ম থেকে তিনি কিনতে পারবেন ফ্লাইট, হোটেল, এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার, ভিসা অ্যাসিসট্যান্স, ট্যুর প্যাকেজ ও ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স। এখানে এয়ারলাইন থেকে ট্রাভেল প্লাটফর্ম-এ রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়।

হলিডে প্যাকেজ: বিমান থেকে পর্যটন

এখানেই এভিয়েশন এবং ট্যুরিজম-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল—কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সিলেট, সুন্দরবন, বান্দরবান, রাঙামাটি, ঐতিহাসিক স্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক গন্তব্য এবং ধর্মীয় পর্যটন। কিন্তু পর্যটনকে শুধু গন্তব্যের মার্কেটিং দিয়ে বড় করা যায় না। দরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা,আবাসন,প্যাকেজ ও অভিজ্ঞতা। একটি এভিয়েশন গ্রুপ যদি নিজের এয়ারলাইন-এর সঙ্গে হোটেল, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর ও হলিডে প্যাকেজ যুক্ত করতে পারে, তাহলে একজন যাত্রীকে শুধু বিমানের আসন নয়, সম্পূর্ণ পর্যটন অভিজ্ঞতা বিক্রি করা সম্ভব।

এয়ারপোর্ট ইকোনমি: আসল বড় স্বপ্ন

সবশেষে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—এয়ারপোর্ট ইকোনমি। একটি বিমানবন্দর শুধু রানওয়ে, টার্মিনাল ও এয়ারপোর্ট-এর জায়গা নয়। এর চারপাশে তৈরি হতে পারে হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, লজিস্টিকস পার্ক, কার্গো ভিলেজ, গুদাম, এমআরও, ক্যাটারিং, খুচরা ব্যবসা, অফিস, কেনাকাটা, বিনোদন, পর্যটন কেন্দ্র এবং ব্যবসায়িক এলাকা। এটাই এয়ারপোর্ট সিটির ধারণার ভিত্তি। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ভবিষ্যৎ এভিয়েশন গ্রুপের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত তখনই পূর্নাঙ্গভাবে সম্ভব যখন এয়ারপোর্ট ইকোনমি শক্তিশালী হবে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে শুধু এয়ারপোর্ট হিসেবে না দেখে গোটা দেশে এভিয়েশন-ভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে বিমানবন্দর জাতীয় অর্থনীতির বড় প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। বাংলাদেশ সরকারও ২০২৬ সালে দীর্ঘমেয়াদি সিভিল এভিয়েশন মাস্টার প্লান প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে এভিয়েশনকে শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও সংযোগ-এর চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এভিয়েশন গ্রুপ মানেই শুধু সম্প্রসারণ নয় এখানে একটি সতর্কতাও জরুরি।

বিমান বাড়ানো, রুট বাড়ানো, সহযোগী ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানো—এসবই  সম্প্রসারণ। কিন্তু এভিয়েশন গ্রুপ-এর সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, নিরাপত্তা, আর্থিক শৃঙ্খলা, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, সম্মতি এবং পরিচালনগত সফলতার উপর।

একসঙ্গে অনেক ব্যবসা শুরু করলে মূলধন বরাদ্দের-এর ঝুঁকি বাড়ে। এভিয়েশন একটি অত্যন্ত মূলধন-নিবিড় এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিল্প। তাই প্রত্যেকটি সহযোগী ব্যবসা-বাণিজ্যের আলাদা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা, মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা এবং নিরাপত্তা কাঠামো থাকা জরুরি। বিশেষ করে সেফটি এবং সিকিউরিটি কখনো কস্ট-কাটিং-এর বিষয় হতে পারে না।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

ইউএস-বাংলা নিকট ভবিষ্যতে পরিকল্পনা অনুযায়ী এভিয়েশন গ্রুপ-এর মডেল বাস্তবায়িত করলে, এর প্রভাব একটি কোম্পানির সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর যেতে পারে। একটি এয়ারক্রাফট শুধু একজন যাত্রী বহন করে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, গ্রাউন্ড স্টাফ, নিরাপত্তা কর্মী, ক্যাটারার, ট্রাভেল এজেন্ট, হোটেল, ট্যুর অপারেটর, কার্গো হ্যান্ডলার, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী, সফটওয়্যার পেশাজীবী এবং হাজার হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থান।

একটি এয়ারক্রাফট অর্থনৈতিক মাল্টিপ্লায়ার। এ কারণেই এভিয়েশন গ্রুপ-এর লক্ষ্যকে শুধু একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পকে নতুন ব্যবসায়িক কাঠামোতে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার, সিএএবি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমান সংস্থা, পর্যটন খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারী—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর-এর সামনে এখন আর ‘কতগুলো বিমান আছে?’—এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত

কতগুলো এয়ারক্রাফট আমরা পরিচালনা করছি, কতটা ভ্যালু চেইন আমরা নিজেদের দেশে তৈরি করছি, কতজন এভিয়েশন প্রফেশনাল তৈরি করছি, কতটা কার্গো আমরা আকর্ষণ করছি, কতটা ট্যুরিজম জেনারেট করছি এবং বিমানবন্দরকে কতটা অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারছি?

ইউএস-বাংলার ২১টি নতুন বোয়িং এয়ারক্রাফট-এর পরিকল্পনা তাই একটি বহর সম্প্রসারণের চেয়ে বড় একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এটি সফল হলে ভবিষ্যতের ইউএস-বাংলাকে শুধু একটি এয়ারলাইন হিসেবে নয়—এয়ারলাইন, কার্গো, পর্যটন, প্রশিক্ষণ, এমআরও, প্রকৌশল, ক্যাটারিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, ডিজিটাল ভ্রমণ এবং বিমানবন্দর অর্থনীতিকে সংযুক্ত একটি এভিয়েশন ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হবে তখনই, যখন আমরা শুধু বিদেশ থেকে বিমান আনব না; বরং বিমান পরিচালনার জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি, মেইনটেন্যান্স, লজিটিকস, ট্যুরিজম এবং এভিয়েশন সার্ভিস-এর একটি বড় অংশ বাংলাদেশেই তৈরি করব। কারণ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু আকাশে নয়—আকাশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে।

আর সেই অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকবে একটি নতুন ধারণা, যা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের চিন্তাপ্রসূত। ‘এয়ারলাইন শুধু একটি এয়ারলাইন নয়—একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন গ্রুপ; একটি বিমানবন্দর নয়—একটি এয়ারপোর্ট ইকোনমি; শুধু যাত্রী পরিবহন নয়—একটি এভিয়েশন কেন্দ্রিক ট্যুরিজম এবং ইকোনমিক ইকোসিস্টেম’।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট