বিজ্ঞাপন

ডেস্টিনেশন ব্র্যান্ডিং

আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে গণমাধ্যম ও ইউএস-বাংলার ভূমিকা

আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে গণমাধ্যম ও ইউএস-বাংলার ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বে পর্যটন কেবল অবকাশযাপনের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। ফলে পর্যটন গন্তব্যের প্রতিযোগিতা এখন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা নৈসর্গিক বৈচিত্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

একজন আন্তর্জাতিক পর্যটক কোথায় যাবেন, কেন যাবেন এবং অন্য একটি গন্তব্যের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দেশকে কেন বেছে নেবেন—এসব সিদ্ধান্তের পেছনে একটি শক্তিশালী ‘ডেস্টিনেশন ব্র্যান্ড’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডেস্টিনেশন ব্র্যান্ডিং হলো কোনো দেশ, শহর, অঞ্চল কিংবা পর্যটনকেন্দ্রকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয়, গল্প, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া।

আর এই প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম-সবকিছু মিলেই একটি দেশের পর্যটন সম্পর্কে মানুষের ধারণা তৈরি করে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশের মতো একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন দেশের জন্য এখন প্রয়োজন গণমাধ্যম, পর্যটন প্রতিষ্ঠান এবং এয়ারলাইনসের সমন্বিত প্রচারণা। এই জায়গায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

গণমাধ্যম কেন গুরুত্বপূর্ণ

একটি পর্যটন গন্তব্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যটকের প্রথম ধারণা অনেক সময় তৈরি হয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি, প্রতিবেদন, ভিডিও, ভ্রমণকাহিনি কিংবা প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে। কোনো দেশের সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, নদী, ঐতিহাসিক স্থাপনা, খাবার, উৎসব, মানুষের জীবনযাপন কিংবা আতিথেয়তা যখন আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়, তখন তা সম্ভাব্য পর্যটকের মনে কৌতূহল তৈরি করে।

তবে গণমাধ্যমের কাজ শুধু প্রচার করা নয়; বরং গন্তব্যের গল্প তৈরি করা। কক্সবাজারকে শুধু দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত হিসেবে উপস্থাপন করলে এর ব্র্যান্ডিং সীমিত থাকবে। এর সঙ্গে সামুদ্রিক জীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি, পাহাড় ও সমুদ্রের বৈচিত্র্য, মহেশখালী, সেন্টমার্টিন, স্থানীয় খাবার, মৎস্যজীবীদের জীবন এবং বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তাকে যুক্ত করা হলে কক্সবাজার হয়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন-অভিজ্ঞতা।

তথ্য থেকে অনুপ্রেরণা

আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণায় গণমাধ্যমকে মূলত তিনটি স্তরে কাজ করতে হয়—তথ্য, বিশ্বাসযোগ্যতা ও অনুপ্রেরণা।

প্রথমত, পর্যটককে সঠিক তথ্য দিতে হবে। কোথায় যাওয়া যায়, কীভাবে যাওয়া যায়, কোথায় থাকা যায়, কোন মৌসুমে ভ্রমণ উপযোগী এবং কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে—এসব তথ্য পর্যটকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

দ্বিতীয়ত, তৈরি করতে হবে বিশ্বাসযোগ্যতা। বিজ্ঞাপনের তুলনায় স্বাধীন সংবাদ প্রতিবেদন, ভ্রমণকাহিনি, প্রামাণ্যচিত্র কিংবা একজন আন্তর্জাতিক পর্যটন সাংবাদিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

তৃতীয়ত, সৃষ্টি করতে হবে অনুপ্রেরণা।

শুধু তথ্য দিয়ে পর্যটককে ভ্রমণে আগ্রহী করা যায় না। তার মনে এমন একটি অনুভূতি তৈরি করতে হয়-‘আমি সেখানে যেতে চাই।’ গল্প বলার শক্তি এখানেই।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা: একটি দেশ, বহু অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। একই দেশের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান, হাওর, নদী, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মসজিদ, বৌদ্ধবিহার, গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি এবং সমৃদ্ধ খাবারের ঐতিহ্য। কিন্তু শুধু এসব সম্পদ থাকলেই হবে না। এগুলো একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অধীনে উপস্থাপন করতে হবে।

পর্যটন প্রচারণার ভাষা শুধু ‘বাংলাদেশে আসুন’ হলে হবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘বাংলাদেশে এসে একজন আন্তর্জাতিক পর্যটক কী ধরনের অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করবেন?’

উত্তর হতে পারে—নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সমুদ্র ও পাহাড়ের সহাবস্থান, স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি, উৎসব এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। অর্থাৎ বাংলাদেশকে শুধু একটি স্থান হিসেবে নয়, একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্র্যান্ড করতে হবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করা

আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে পৌঁছাতে শুধু দেশীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, ভ্রমণবিষয়ক সাময়িকী, পর্যটন লেখক, ভ্রমণচিত্র নির্মাতা, আলোকচিত্রী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়বস্তু নির্মাতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও ভ্রমণবিষয়ক বিষয়বস্তু নির্মাতাদের বাংলাদেশ ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।

তারা নিজের চোখে সুন্দরবনের সূর্যোদয় দেখবেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, বাংলাদেশের খাবার খাবেন, পাহাড়ি অঞ্চলের সংস্কৃতি দেখবেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরবেন। এ ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি প্রতিবেদন প্রচলিত বিজ্ঞাপনের তুলনায় অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে।

ডিজিটাল মাধ্যমের শক্তি

ডেস্টিনেশন ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম বিপ্লব ঘটিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পর্যটন বিপণনের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষ করে দৃশ্যভিত্তিক বিষয়বস্তু অত্যন্ত কার্যকর। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি আকর্ষণীয় ভিডিও অনেক সময় দীর্ঘ বিজ্ঞাপনের চেয়েও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তাই বাংলাদেশের পর্যটন প্রচারণায় উচ্চমানের আলোকচিত্র, আকাশচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও, প্রামাণ্যচিত্র এবং পর্যটকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে শুধু সুন্দর দৃশ্য দেখালেই হবে না। গল্প থাকতে হবে। ‘একদিন সুন্দরবনে’, ‘বাংলাদেশের চায়ের দেশ’, ‘বাংলাদেশের নদী’, ‘বাংলাদেশের স্বাদ’ কিংবা ‘পাহাড় থেকে সমুদ্র’-এ ধরনের বিষয়ভিত্তিক প্রচারণা বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিচয় আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারে।

পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

একটি দেশীয় এয়ারলাইন কীভাবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণার অংশীদার হতে পারে? উত্তরটি খুবই সরল। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশের একটি বিজ্ঞাপন দেখলেন। এরপর তিনি যদি বাংলাদেশে আসার জন্য সহজ, নির্ভরযোগ্য ও সরাসরি বিমান যোগাযোগ পান, তাহলেই প্রচারণাটি বাস্তব ভ্রমণে রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ পর্যটককে শুধু বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখালেই হবে না; সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর পথও তৈরি করতে হবে। আর সেই পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এয়ারলাইন।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে তাই শুধু যাত্রী পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক রুট, বিদেশি বিমানবন্দর, যাত্রীসেবা, নিজস্ব প্রচারমাধ্যম, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দেশের ভ্রমণকারীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের কারণে একটি দেশীয় এয়ারলাইন বাংলাদেশের ভ্রাম্যমাণ দূত হিসেবেও কাজ করতে পারে।

ফ্লাই বাংলাদেশ, এক্সপেরিয়েন্স বাংলাদেশ

ইউএস-বাংলার আন্তর্জাতিক রুটগুলোকে বাংলাদেশের পর্যটন প্রচারণার সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে একটি শক্তিশালী প্রচারণা তৈরি হতে পারে। এর মূল বার্তা হতে পারে—‘ফ্লাই বাংলাদেশ, এক্সপেরিয়েন্স বাংলাদেশ।’ অর্থাৎ বিমানযাত্রাকেই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার প্রথম ধাপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিমানের প্রচারণায় শুধু টিকিট বা গন্তব্যের তথ্য নয়; বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, খাবার, ঐতিহ্য এবং পর্যটনকেন্দ্রের গল্প তুলে ধরা যেতে পারে।

উড়োজাহাজের কেবিন থেকেই পর্যটন প্রচারণা

একজন বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুরু হতে পারে উড়োজাহাজের কেবিন থেকেই। উড়োজাহাজের আসন, কেবিন ক্রু, খাবার, বিনোদন, যাত্রীসেবা, প্রচারপত্র এবং বিভিন্ন দৃশ্যমান উপস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়ে একটি দেশের পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব।

ইউএস-বাংলার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে নিয়মিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা যেতে পারে। এয়ারলাইন্সের ইন-ফ্লাইট ম্যাগাজিনে প্রতি সংখ্যায় বাংলাদেশের একটি পর্যটন গন্তব্যকে বিশেষভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। এক সংখ্যায় সুন্দরবন, পরের সংখ্যায় কক্সবাজার, এরপর সিলেট, পাহাড়, নদী কিংবা বাংলাদেশের খাবার-এভাবে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।

তাহলে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের একটি ভ্রাম্যমাণ পর্যটন প্রচারণা।

একটি রুট, একটি পর্যটন গল্প

ইউএস-বাংলার প্রতিটি আন্তর্জাতিক রুটকে একটি নির্দিষ্ট পর্যটন বাজার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কুয়ালালামপুর থেকে আসা পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশের প্রকৃতি, খাবার, নদী ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্য, প্রকৃতি, বিলাসবহুল ভ্রমণ, খাবার ও স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণপ্যাকেজ তুলে ধরা যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি তাদের বিদেশি বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি বাজারের জন্য একই প্রচারণা নয়; প্রয়োজন একটি রুট, একটি পর্যটন গল্প।

গণমাধ্যম, পর্যটন ও এয়ারলাইনের ত্রিমুখী অংশীদারত্ব

বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং সফল করতে হলে একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। এয়ারলাইন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, গণমাধ্যম-এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণাকে নতুন মাত্রা দিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, ভ্রমণ সংস্থা, স্থানীয় সরকার, পর্যটন উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাত।

ইউএস-বাংলা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, পর্যটন লেখক, আলোকচিত্রী ও বিষয়বস্তু নির্মাতাদের বাংলাদেশ ভ্রমণের সুযোগ দিতে পারে। তাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি প্রতিবেদন ও ভিডিও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি হবে বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর—কারণ এখানে থাকবে অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

স্টপওভার বাংলাদেশ: নতুন পর্যটন ভাবনা

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ‘স্টপওভার বাংলাদেশ’ ধরনের একটি নতুন পর্যটন ধারণা তৈরি করা যেতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দুই থেকে চার দিনের স্বল্পমেয়াদি পর্যটন কর্মসূচি তৈরি করা সম্ভব।

একজন আন্তর্জাতিক যাত্রী অন্য কোনো দেশে যাওয়ার পথে বাংলাদেশে কয়েক দিন অবস্থান করতে পারেন। তিনি ঢাকা, সুন্দরবন, কক্সবাজার কিংবা সিলেট ঘুরে দেখতে পারেন। বিমানভাড়া, হোটেল, অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও পর্যটনসেবা একত্র করে সহজ প্যাকেজ তৈরি করা গেলে এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন পর্যটন বাজার সৃষ্টি করতে পারে। এতে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে না; একজন বিদেশি পর্যটকের কাছ থেকে দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য আয়ও বাড়বে।

বাংলাদেশের পর্যটনের নিজস্ব বিষয়বস্তু নির্মাণ কেন্দ্র

ইউএস-বাংলা চাইলে নিজস্ব পর্যটন বিষয়বস্তু নির্মাণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে নিয়মিত আলোকচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, সাক্ষাৎকার ও ভ্রমণকাহিনি তৈরি করা যেতে পারে। এসব বিষয়বস্তু শুধু ইউএস-বাংলার নিজস্ব মাধ্যমেই নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পর্যটনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু—‘বাংলাদেশ সুন্দর’ এই বার্তা দেওয়া নয়। বরং আন্তর্জাতিক দর্শকের মনে প্রশ্ন তৈরি করা- ‘আমি এখনো বাংলাদেশে যাইনি কেন?’ একটি সফল পর্যটন ব্র্যান্ডের সাফল্য এখানেই।

দায়িত্বশীল পর্যটন ও সামাজিক উদ্যোগ

এয়ারলাইনের সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যক্রমও পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হতে পারে। সুন্দরবন সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় কারুশিল্পীদের সহায়তা, স্থানীয় তরুণদের পর্যটন ও আতিথেয়তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ—এসব উদ্যোগ একটি এয়ারলাইনকে শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, দায়িত্বশীল পর্যটনের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যটক এখন শুধু সুন্দর জায়গা দেখতে চান না; তারা জানতে চান সেই গন্তব্য পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি কতটা দায়িত্বশীল। সুতরাং পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে।

প্রয়োজন বাংলাদেশের একটি জাতীয় পর্যটন ব্র্যান্ড

বাংলাদেশে একটি সুসংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি ও আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় পর্যটন ব্র্যান্ড প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট জাতীয় পর্যটন ব্র্যান্ড তৈরি করে তার অধীনে এয়ারলাইন, বিমানবন্দর, হোটেল, ভ্রমণ সংস্থা, গণমাধ্যম, পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে হবে। এখানে ইউএস-বাংলার মতো দেশীয় এয়ারলাইন হতে পারে অন্যতম প্রধান বেসরকারি অংশীদার।

কারণ একজন পর্যটক বাংলাদেশের প্রচারণা দেখবেন এক জায়গায়, বিমানের টিকিট কিনবেন অন্য জায়গায়, বিমানবন্দরে আসবেন আরেক জায়গায় এবং গন্তব্যে গিয়ে হোটেলে উঠবেন। কিন্তু তার পুরো ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার প্রতিটি ধাপ যদি একই গল্পের অংশ হয়, তাহলেই তৈরি হবে একটি শক্তিশালী জাতীয় পর্যটন ব্র্যান্ড।

আকাশপথকে করতে হবে পর্যটনের প্রবেশদ্বার

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই। সুন্দরবন আছে, কক্সবাজার আছে, পাহাড় আছে, নদী আছে, ইতিহাস আছে, খাবার আছে, সংস্কৃতি আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা-আছে মানুষের আতিথেয়তা।

ঘাটতি রয়েছে এসব সম্পদকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের ভাষায় একটি আকর্ষণীয়, বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপনের। এখানেই গণমাধ্যম, পর্যটন প্রতিষ্ঠান এবং এয়ারলাইন্সের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স যদি তার আন্তর্জাতিক রুটগুলোকে শুধু যাত্রী পরিবহনের পথ হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের পর্যটন সংযোগের পথ হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য পর্যটন প্রচারণার প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা থেকে যখন একটি উড়োজাহাজ সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো শহরের উদ্দেশে উড়ে যায়, তখন সেটি শুধু যাত্রী বহন করে না; একই সঙ্গে বহন করতে পারে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাবার ও মানুষের আতিথেয়তার গল্প। আর সেই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের পর্যটন প্রচারণার নতুন দর্শন হতে পারে-

ফ্লাইট বাংলাদেশ। ডিসকভার বাংলাদেশ। এক্সপেরিয়েন্স বাংলাদেশ।

এটি শুধু একটি এয়ারলাইনের বিপণন কৌশল নয়। সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম শক্তিশালী কৌশল।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট