বিজ্ঞাপন

এভিয়েশন খাতের সবচেয়ে বড় সংকট দক্ষ জনবলের ঘাটতি : মাহমুদ হোসেন

এভিয়েশন খাতের সবচেয়ে বড় সংকট দক্ষ জনবলের ঘাটতি : মাহমুদ হোসেন

ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেছেন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এভিয়েশন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের জন্য এ খাতের সবচেয়ে বড় সংকট উড়োজাহাজের ঘাটতি নয়, দক্ষ জনবলের অভাব। পাইলট, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীসহ প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহমুদ হোসেন বলেন, আধুনিক বিশ্বে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির দিক থেকে এভিয়েশনের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। আগামী দিনে এভিয়েশন ভূরাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। ২০৪০ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের চাহিদার বড় অংশ তৈরি হবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে। অথচ এসব উড়োজাহাজের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচল বাড়াতে এভিয়েশন খাতকে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আকাশপথে পণ্য পরিবহন দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। যাত্রী পরিবহনে বছরে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্ব গড়ের চেয়ে বেশি হবে। চীন ও ভারত এ প্রবৃদ্ধির বড় চালক হলেও ভিয়েতনামের মতো দেশও এভিয়েশন খাতের দ্রুত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মাহমুদ হোসেনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৪৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৭ লাখ পাইলট, ৭ লাখ ২৮ হাজার উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এবং প্রায় ১০ লাখ কেবিন ক্রুর প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবছর ভারতের প্রয়োজন হবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার পাইলট। আর বাংলাদেশের প্রয়োজন হতে পারে বছরে ৭০ থেকে ১০০ পাইলট। ভারতে প্রতিবছর ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের জন্য প্রতিবছর কতজনের প্রয়োজন, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই।

দেশে পাইলট প্রশিক্ষণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক এই বেবিচক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফ্লাইং অ্যাকাডেমি অ্যান্ড জেনারেল এভিয়েশন লিমিটেড আর্থিক সমস্যার কারণে ২০২৬ সালের আগস্টে কার্যক্রম বন্ধ করেছে বলে জানানো হয়েছে। গ্যালাক্সি ফ্লাইং অ্যাকাডেমিতে বর্তমানে মাত্র তিনটি সচল উড়োজাহাজ রয়েছে, যেগুলো দিয়ে বছরে দুইজন পাইলট তৈরি করা সম্ভব। আরাং ফ্লাইং স্কুলও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশে পাইলট প্রশিক্ষণের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর সংকটের কথাও তুলে ধরে মাহমুদ হোসেন বলেন, দেশে লাইসেন্সধারী উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর ঘাটতি রয়েছে। এর পেছনে অ্যাকাডেমিক অবকাঠামোর ঘাটতি, নিয়োগে জটিলতা, ভিসা ও আধুনিকায়ন পরিকল্পনার সমস্যা এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং বেবিচকের প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমের মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু উড়োজাহাজ ও বিমানবন্দর বাড়ালেই হবে না। একটি শক্তিশালী এভিয়েশন সংস্কৃতি ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মানবসম্পদ, শিল্প, অবকাঠামো, উদ্যোক্তা, একাডেমিয়া এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এই ছয়টি বিষয়কে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। পাইলট, প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারসহ কারিগরি ও অকারিগরি পেশাজীবীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও সেবাদাতাদেরও এ ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মাহমুদ হোসেন বলেন, দেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহনের বাজারের আকার প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলার। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৮ সালের মধ্যে দেশে বিমান পরিবহন ১৬৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে অতিরিক্ত ১ কোটি ২১ লাখ থেকে ৩ কোটি যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন। এ প্রবৃদ্ধির ফলে দেশের জিডিপিতে প্রায় ২১০ থেকে ৩২০ কোটি ডলার যুক্ত হতে পারে এবং ২ লাখ থেকে ৪ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীসংখ্যার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বিমানবন্দরটিতে মোট যাত্রী ছিল ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ১ কোটি ১৭ লাখ। ২০২৫ সালে অভ্যন্তরীণ যাত্রী ছিল প্রায় ২৪ লাখ ১০ হাজার এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিল ১ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার। ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার অভ্যন্তরীণ এবং প্রায় ৩০ হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী বিমান ব্যবহার করেন। যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে অবকাঠামো উন্নত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিমানের বহর ২০২৭ সালের মধ্যে ইজারা নেওয়া উড়োজাহাজসহ ১৯টি থেকে ২৯টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩৫ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে এ বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ১৫০ কোটি ডলারের বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার আওতায় ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নভোএয়ার তিনটি এবং এয়ার অ্যাস্ট্রা দুটি নতুন ইজারাকৃত উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ফলে ২০২৭ সালের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা, এয়ার অ্যাস্ট্রা ও নভোএয়ার— এই চারটি দেশীয় এয়ারলাইন তাদের বহরে মোট ৪০টি উড়োজাহাজ বাড়াতে পারে।

সম্মেলনে বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।

এ আয়োজনে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অন্যান্য অংশীজন অংশ নেন। সম্মেলনে গোল্ড স্পন্সর হিসেবে ছিল ইউএস-বাংলা গ্রুপ।

আরএইচটি/আরএফ