হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরটির যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ২ কোটির বেশি হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম।
তিনি বলেছেন, বর্তমানে টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে এই দুই টার্মিনাল দিয়ে ১ কোটি ২৬ লাখের বেশি যাত্রী সেবা নিচ্ছেন। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি হবে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলায় ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বর্ণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নূর-ই-আলম বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের পক্ষে বক্তব্য রাখেন
নূর-ই-আলম বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। এটি চালু হলে শুধু যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাই বাড়বে না, বরং যাত্রীদের জন্য আরও আধুনিক, নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর মোট আয়তন প্রায় ১ লাখ বর্গমিটার। তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত হলে এর সঙ্গে আরও প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার বর্গমিটার নতুন অবকাঠামো যুক্ত হবে। ফলে তিনটি টার্মিনাল মিলিয়ে মোট আয়তন দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার বর্গমিটার। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ৮৪ হাজার টন। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫৭ হাজার টনে উন্নীত হবে। রপ্তানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৭ হাজার টনে উন্নীত হবে।
তিনি আরও বলেন, যাত্রীসেবার ক্ষেত্রেও বাড়বে সক্ষমতা। বর্তমানে বিমানবন্দরে ৬২টি চেক-ইন কাউন্টার রয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত হলে এ সংখ্যা বেড়ে ১৮৯টিতে দাঁড়াবে। পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ কাউন্টার থেকে বেড়ে ২৩৬টি হবে। ভবিষ্যতে বোর্ডিং গেটের সংখ্যা ৩৪টিতে উন্নীত করার সুযোগ থাকবে। কার পার্কিং সুবিধাও বর্তমানে ৮০০টি গাড়ি থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০টি গাড়িতে উন্নীত হবে।
তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে বলে জানান নূর-ই-আলম। তিনি বলেন, এর সফল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশন প্রস্তুতি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং নেগোসিয়েশন কার্যক্রম ইতোমধ্যে এগিয়ে চলছে। এসব কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, তবে তৃতীয় টার্মিনালের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে রানওয়ে ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের সঙ্গে কয়েকটি হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ে যুক্ত হওয়ায় রানওয়ে অকুপেন্সি টাইম অনেকাংশে কমেছে। বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২০ থেকে ২২টি ফ্লাইট হ্যান্ডেল করার সক্ষমতা রয়েছে। ভবিষ্যতে তা সর্বোচ্চ ২৪ থেকে ২৬টি ফ্লাইটে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে দ্বিতীয় একটি রানওয়ে ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু ঢাকার বিমানবন্দর চারদিক থেকে আবাসিক এলাকা দিয়ে ঘিরে যাওয়ায় জায়গার সংকট রয়েছে। আরেকটি রানওয়ে তৈরি করলেও সেটিকে ইমার্জেন্সি রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করতে ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেমসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হবে। রানওয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান রানওয়ের তৃতীয় ওভারলের পর যতটুকু সময় হাতে থাকবে, তার মধ্যে রানওয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে চিন্তা করতে হবে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অন্য কোনো জায়গায় নতুন বিমানবন্দর চালুর বিষয়েও সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে।
বেবিচক সদস্য বলেন, এদিকে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের সামগ্রিক সক্ষমতাও বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের ৫৬টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এয়ার সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট রয়েছে। ৩৪টি বিদেশি ন্যাশনাল এয়ারলাইনস, ৭টি কার্গো এয়ারলাইনস এবং ৪টি দেশীয় এয়ারলাইনস নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বাংলাদেশি এয়ারলাইনস ১৭টি দেশের ২৫টি গন্তব্যে সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
বিমান চলাচলের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে ৬৬ হাজার ৬৭৫টি। ২০২৫ সালে তা হয়েছে ৬৫ হাজার ৭৯টি। তবে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন ২০২৪ সালের ১ কোটি ২০ লাখ ৫ হাজার ৬৯০ জন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ জন হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগেও যাত্রী বেড়েছে। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রী পরিবহন হয়েছে ৪৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৬ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৭৮ জনে।
নূর-ই-আলম বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে হওয়ায় দেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। এতে বক্তব্য রাখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক।
সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন।
এ আয়োজনে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অন্যান্য অংশীজনরাও অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনে গোল্ড স্পন্সর হিসেবে ছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।
/এমএইচএন/এমএসএ
