ঢাবিতে জুলাই গণহত্যা মামলার আসামি গোলাম রব্বানী হলেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান

জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানীকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৭ ডিসেম্বর এই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বিশ্বাসের মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। সেই শূন্য পদেই বর্তমানে অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পরপরই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এ নিয়োগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তিনি ঢাকা মহানগর মূখ্য হাকিম আদালতে দায়ের হওয়া মামলার ৮ নম্বর আসামি। মামলাটির প্রধান আসামি হিসেবে রয়েছেন পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ ছাড়া একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পুলিশের সাবেক আইজিপি মো. জাবেদ পাটোয়ারী এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম রয়েছে।
অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২২ সালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা ছাত্রদলের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর ও ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতেও তিনি অভিযুক্ত।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন ও একাডেমিক বয়কট শুরু করলে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিভাগে উপস্থিত হন। তবে এরপরও জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল শাখার এক নেতাকে গোপনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত শিক্ষক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী ঢাকা পোস্টকে জানান, নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সবকিছু হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্র। আমরা অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বিশ্বাস স্যারকে হারিয়েছি। আমি আশা করি আমার শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখবে।
প্রশাসন থেকে কিছু জানানো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় তার নিয়মমাফিক যা করার দরকার তা করেছে। আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
ঢাবি প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি ডাকসুর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক প্রক্টর ও জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার মামলার আসামি অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানীকে বিভাগীয় চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দ। একইসঙ্গে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণসহ সংশ্লিষ্ট সকল ফ্যাসিবাদী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ অভিযোগ করে বলেন, আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্র গণহত্যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে, মদদ দিয়েছে কিংবা সমর্থন জানিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ দাবিতে আমরা বহুবার স্মারকলিপি দিয়েছি, লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার দায়িত্বে থেকেও তিনি (গোলাম রাব্বানী) বহু ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ডেকে এনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাদের পরবর্তীতে রাতের পর রাত নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও নুরুল হক নূরের ওপর হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ২০২২ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ওপর নির্মম হামলার সময়ও তার প্রত্যক্ষ মদদ ও অংশগ্রহণ ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়, ৩ আগস্ট যখন সারাদেশে গণহত্যা চলছিল, তখন তিনি অপরাজেয় বাংলার সামনে মানববন্ধন ও মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে গণহত্যার সমর্থন এবং ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার মদদ দিয়েছিলেন।
মোসাদ্দিক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সমস্যার সমাধান চাই। তবে আগামীকালের মধ্যে ড. গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় সম্পূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিতে হবে। আমরা আইন হাতে তুলে নিতে চাই না, কিন্তু প্রশাসন যদি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ছাত্র-জনতাকে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হতে হবে।
এসএআর/এমএসএ