ইট-পাথরের নয়, আত্মত্যাগের ইতিহাস ইবির শহিদ মিনার

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রধান ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতেই যে বিশালতা দর্শনার্থীদের নজর কেড়ে নেয়, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ৪০০ বর্গফুটের এ শহিদ মিনারটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং দীর্ঘ আড়াই দশকের লড়াইয়ের এক জীবন্ত ইতিহাস।
দেশের ক্যাম্পাস-ভিত্তিক শহিদ মিনারগুলোর মধ্যে এটি বৃহত্তম এবং উচ্চতার দিক থেকে জাতীয় শহিদ মিনারের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহিদ মিনার। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতিতে উজ্জীবিত হয়ে, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের আদলে এটি স্থাপন করা হয়।
দৃষ্টিনন্দন এই শহিদ মিনারটি স্থাপনে রয়েছে একটি সংগ্রামের ইতিহাস। ইবি ক্যাম্পাস গাজীপুরে থাকাকালীন ১৯৮৬ সালে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার দাবি জানালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এন এম মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য বলেন, “এ বিশ্ববিদ্যালয় শহিদ মিনার নির্মাণ ও ফুল দেওয়ার নামে কোন অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। শহিদ মিনার নির্মাণের নামে যারা বিশ্ববিদ্যালয় মূর্তি পূজা করবে, তাদের বহিষ্কার করা হবে।”
পরবর্তীতে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১১ সালে প্রগতিশীল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মহাজোট সরকারের সহযোগিতায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহিদ মিনার নির্মাণ করা। ২০০৯ সালে তৎকালীন উপাচার্য মুক্তিযোদ্ধা এম আলাউদ্দিন শহিদ মিনার নির্মাণের ঘোষণা দেন। ২০১১ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এই শহিদ মিনারটি উদ্বোধন করেন।
এটি দেশের ক্যাম্পাস ভিত্তিক সর্ববৃহৎ শহিদ মিনার। শহিদ মিনারটির মূল বেদী ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৬৫ ফুট প্রস্থ। মাটির উপর থেকে মূল বেদী ৯ ফুট উপরে। তিন পাশ দিয়ে ওঠার জন্য কারুকার্য খচিত সিরামিক ইট দিয়ে তৈরি সিঁড়ি রয়েছে। মূল বেদীতে র্যাম্প রয়েছে, যাতে পঙ্গু ও প্রতিবন্ধীরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিজ আহমেদ বলেন, আমরা যে ভাষায় আজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনের ভাব প্রকাশ করি— তা অর্জনের পেছনে রয়েছে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ। তাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ ভাষা শহিদদের স্মরণে ইবিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সর্ববৃহৎ শহিদ মিনার আমাদের গর্বের প্রতীক। এটি ইবির মর্যাদা ও ঐতিহ্যকে বহন করে। আমরা এই বিখ্যাত স্থাপনাটিকে আরও নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন করার জোর দাবি জানাই।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ভাষা, দেশ ও জাতির জন্য যারাই জীবন দিয়েছে তাদের স্মরণে প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন স্থাপনা থাকাটা নিতান্তই কাম্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শহিদ মিনারটি রয়েছে তার মাধ্যমে আমরা ভাষা শহিদদের স্মরণ করি ও শ্রদ্ধা জানাই। যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল তাদের নামফলক ও জীবনবৃত্তান্ত মিনারে থাকা উচিত। একইসাথে জুলাই বিপ্লবের শহিদদের নামফলক ও জীবনবৃত্তান্ত উল্লেখ করে স্থাপনা নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার আজ কেবল ভাষা দিবসের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রগতিশীল রাজনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যে মিনারকে এক সময় ‘মূর্তি পূজা’র অপবাদ সইতে হয়েছিল, আজ সেই মিনারই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দেশপ্রেম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।
মাওয়াজুর রহমান/এসএইচএ