সেন্টমার্টিনের জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১১ দফা দাবি

সেন্টমার্টিনের জেলেদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১১ দফা দাবি জানিয়েছে ‘টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জেলে পরিবার’ ও সংহতি গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট এবং সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স (সিসিডি)।
রোববার (৮ মার্চ) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
এ সময় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জেলে পরিবারের সদস্য ও সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা মো. জোবায়ের বলেন, ‘বিগত ৬ মাস ধরে মায়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪০০ জন বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে যায়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জন জেলে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ফেরত আসা জেলেদের বয়ান অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে তাদের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং অনেককে দাস শ্রমিকের মতো কাজ করানো হয়েছে। নির্যাতনের ফলে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ও পচন ধরেছে। অথচ দেশে ফিরে আসার পরও তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পাননি; এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, যে ট্রলারগুলো তাদের একমাত্র জীবিকার উৎস ছিল, সেগুলোও আরাকান বাহিনী ফেরত দেয়নি। ফলে পরিবারগুলো আজ চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একইসঙ্গে সমুদ্রে যেতে ভয় পাচ্ছেন টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের জেলেরা। এই পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমুদ্র অঞ্চলে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে।
মো. জোবায়ের বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাস্তবতা আরও কঠিন। যখন মাছ ধরা বন্ধ থাকে এবং পর্যটন কার্যক্রমও স্থবির হয়ে যায়, তখন বিকল্প আয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বহু পরিবার প্রায় অনাহারে দিন কাটায়। গত কয়েক বছরে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার চাপে অনেকেই তাদের পূর্বপুরুষের জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। সেই জমিতে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে অপরিকল্পিতভাবে হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠছে, যার বেশিরভাগ মালিক ঢাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বিশ্বের অন্যতম বিরল প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের আয়তন ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের জেলে পরিবারগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। তারা বাংলাদেশের জনগণ, নাগরিক সমাজ এবং সরকারের কাছে ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করছে।
দাবিগুলো হলো
১। আরাকান বাহিনীর হাতে আটক সব জেলেকে অনতিবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের ট্রলারগুলোও ফেরত আনা।
২। দেশে ফিরে আসা ৭৩ জন জেলের জন্য জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৩। আরাকান বাহিনীর হাতে নিখোঁজ জেলেদের প্রকৃত সংখ্যা যথাযথ তদন্ত ও তথ্যসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনগণের সামনে প্রকাশ করা।
৪। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমুদ্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা জোরদার করা।
৫। জেলেদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে এবং মাছ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা বা বেকার ভাতার ব্যবস্থা চালু করা।
৬। সেন্টমার্টিনে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং একটি ইকো-ট্যুরিজম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা।
৭। দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং ভূমি ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া।
৮। সেন্টমার্টিনের সব বাসিন্দার জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা।
১। দ্বীপের প্রায় ১২,০০০ নারী ও পুরুষের জন্য বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
১০। সেন্টমার্টিনের জন্য জরুরি ও নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে সমুদ্র অ্যাম্বুলেন্স চালু করা।
১১। টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবি, কোস্টগার্ড, নেভি ও পুলিশসহ সব প্রশাসনিক বাহিনীকে আরও জনবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা।
এসএআর/জেডএস