উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী জিনিয়া তাসনিম। একাডেমিক ফল, সিলেবাস, ক্রেডিট— সব দিক থেকেই তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সুইডেনযাত্রার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কোনো একাডেমিক দুর্বলতায় নয়; বরং নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নথিপত্র তুলতে অসহনীয় বিলম্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ভেরিফিকেশন ফি’ দাবির মতো প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতায়।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী জিনিয়া তাসনিমের এই ঘটনা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঢাবি শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটি কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা নয়; বরং দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, সেবাব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব মানসিকতার ঘাটতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
জিনিয়া তাসনিমকে সুইডেন কর্তৃপক্ষের পাঠানো মেইলে দেখা যায়, দেশটির ভর্তি কর্তৃপক্ষ তার একাডেমিক নথিপত্র যাচাই (ভেরিফিকেশন) করতে চাইলে ঢাবি কর্তৃপক্ষ ফি দাবি করে। কিন্তু সুইডিশ কর্তৃপক্ষ সেই ফি দিতে রাজি না হওয়ায় তার আবেদনটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনিক জটিলতায় থমকে গেল সুইডেনযাত্রা
জিনিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার জন্য ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের ৩১০ নম্বর কক্ষে আবেদন করতে হয়। গত ২২ ডিসেম্বর আবেদনের পর আমাকে বলা হয়েছিল জরুরি ভিত্তিতে সাত দিনের মধ্যে ট্রান্সক্রিপ্ট পাওয়া যাবে। এরপর ৭ জানুয়ারি যোগাযোগ করলে আমাকে আবারও কয়েক দিনের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমি তা পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নথিপত্র প্রস্তুত না থাকলে আমাকে বারবার আসতে বলা হতো। কখনও ট্রান্সক্রিপ্টের জন্য, কখনও সত্যায়নের (অ্যাটেস্টেশন) জন্য যেতে হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় আমাকে একাধিক দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।’
বিজ্ঞাপন
জিনিয়া জানান, প্রতি পৃষ্ঠা ও খাম সত্যায়নের জন্য অতিরিক্ত ২০০ টাকা করে ফি দেওয়ার পরও তাকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা ও চাপের মুখে প্রায় দুই সপ্তাহ পর তিনি নথিপত্র হাতে পান। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সুইডেনে উচ্চশিক্ষার আবেদনের ফলাফল যাচাই করতে গিয়ে তিনি দেখেন তার স্ট্যাটাস ‘অযোগ্য’ (Ineligible) দেখাচ্ছে। সেখানে উল্লেখ ছিল, তার স্নাতক ডিগ্রির ক্রেডিট ১৮০ ইসিটিএস (ECTS)-এর কম। অথচ তার সিলেবাস অনুযায়ী এই ডিগ্রির মান ২৪০ ইসিটিএস-এর সমতুল্য।

মূল জটিলতা ক্রেডিটের হিসাব নয়, বরং নথিপত্র যাচাই নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে আগে কখনও জানায়নি যে বিদেশি কর্তৃপক্ষ একাডেমিক নথি যাচাই করতে চাইলে আলাদা ফি দিতে হবে। ফলে আবেদন প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে পুরো বিষয়টি ভেস্তে যায়— বলেন জিনিয়া।
নথি যাচাই ফি পর্যালোচনায় প্রশাসন
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সী শামস উদ্দিন আহমেদ বলেন, “নথিপত্র যাচাইয়ের নির্ধারিত ফি আগে থেকেই চালু আছে। সুইডিশ কর্তৃপক্ষকে কীভাবে এই ফি’র কথা জানানো হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে।”
যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা জানান, বিষয়টি নজরে আসার পর তিনি রেজিস্ট্রারকে পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘২৯ মার্চ সকালে আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোথায় কত ফি নেওয়া হয়, তার একটি তালিকা চেয়েছি। সেটি পাওয়ার পর আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করব।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আগে ভেরিফিকেশনের ই-মেইল পাঠানোর চার্জ ৫০ ডলার ছিল, যা পরে কমিয়ে ১০ ডলার করা হয়েছে। আমরা পুরো প্রক্রিয়াটিকে শিক্ষার্থীবান্ধব করতে চাই এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার কাজ করছি।’
একজন জিনিয়া নন, ঝুঁকিতে অনেকে
জিনিয়া তাসনিমের ঘটনা সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতি বছর বহু শিক্ষার্থী দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রান্সক্রিপ্ট, সনদ, সিলেবাস, মিডিয়াম সার্টিফিকেট, সমতা যাচাইসহ নানা নথির ওপর নির্ভর করেন। এই নথিপত্র সময়মতো না পাওয়া, সঠিকভাবে সত্যায়িত না হওয়া, কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভেরিফিকেশন অনুরোধে দ্রুত সাড়া না দেওয়া— এসব সমস্যার মুখে অসংখ্য শিক্ষার্থী নিঃশব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাতে ইচ্ছুক ঢাবি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘জিনিয়া তাসনিমের ঘটনাটি সামনে আসার পর আমাদের মতো অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে গেলে শুধু ভালো ফলাফল করলেই হয় না; সময়মতো ট্রান্সক্রিপ্ট, সনদ, মিডিয়াম সার্টিফিকেট, সিলেবাসসহ নানা নথি সংগ্রহ ও সত্যায়ন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব নথি তুলতে গিয়ে যদি শিক্ষার্থীদের বারবার দৌড়াতে হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, কিংবা কোন ধাপে কী লাগবে— সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকে, তাহলে পুরো আবেদন প্রক্রিয়াই ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়।’

এ নিয়ে ঢাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) বলেন, ‘আমরা পুরো প্রক্রিয়াটি শিক্ষার্থীবান্ধব করতে চাই। ট্রান্সক্রিপ্ট ও মার্কশিটের বিষয়ে গত আট-নয় মাস ধরে আমি নিজে কাজ করছি। গত বছরের মে মাস থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য ট্রান্সক্রিপ্ট ও মার্কশিটের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ অটোমেটেড হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়াগুলো যত বেশি ডিজিটালাইজড করা যাবে, শিক্ষার্থীদের জন্য তত বেশি সহজ ও সহায়ক হবে।’
স্বপ্নভঙ্গের দায় কার?
জিনিয়া তাসনিম জানান, পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত ট্রান্সক্রিপ্ট ও সার্টিফিকেট যাচাই ঘিরে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে সৃষ্ট ভুল–বোঝাবুঝি। যেহেতু ট্রান্সক্রিপ্ট ও সার্টিফিকেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইস্যু করা হয়, তাই বিভ্রান্তিরও সূচনা হয়েছে সেখান থেকেই।
পরবর্তীতে তিনি কী পদক্ষেপ নিয়েছেন— এমন প্রশ্নের জবাবে জিনিয়া জানান, বিষয়টি জানিয়ে সুইডিশ কর্তৃপক্ষকে ই-মেইল করলে তাকে বলা হয়, বিষয়টি বিবেচনা করা হবে এবং পরে জানানো হবে। আদৌ এটির কোনো সমাধান হবে কি না, এখন পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাননি।
সুইডেনে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আপাতত ভেঙে গেছে তার। কিন্তু এ ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিতে না পারে, তবে এই স্বপ্নভঙ্গ ভবিষ্যতে আরও বহু শিক্ষার্থীর নিয়তি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এসএআর/এমএআর/
