গত জুলাইয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এর মধ্যে একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, ৯ জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতিসহ বেতন কমানো হয়েছে এবং ২ জন শিক্ষককে সতর্ক করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৭ জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তৎকালীন উপাচার্য (ভিসি), উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি, প্রশাসন) এবং কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আলাদা তিনটি স্ট্রাকচার (তদন্ত) কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৫ জুন) বিকেল ৪টা থেকে শুরু হয়ে ভোর পৌনে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে টানা প্রায় ১৩ ঘণ্টাব্যাপী এক সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান সাংবাদিকদের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসরাফিল আহমেদ রঙ্গন, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. আলমগীর কবির, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান ও অধ্যাপক বশির আহমেদ, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজউদ্দিন শিকদার, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের শাস্তি হিসেবে বেতন স্কেলের নিম্নধাপে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে আগামী ৫ বছর সব ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তবে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ২ বছর পর তারা পুনরায় পদোন্নতির আবেদন করতে পারবেন।
এছাড়া গুরুতর শাস্তি হিসেবে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে ‘প্রভাষক’ পদে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে ‘সহকারী রেজিস্ট্রার’ পদে পদাবনতি (ডিমোশন) করা হয়েছে। তারাও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ২ বছর পর পদোন্নতির আবেদনের সুযোগ পাবেন। অন্যান্য সিদ্ধান্তের মধ্যে ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ মামুনকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। এর মধ্যে অধ্যাপক ড. এ মামুনকে আগামী ৫ বছরের জন্য যেকোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
বিপরীতে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ৮ জনকে। তারা হলেন— আইবিএ-জেইউ-এর সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহিরুল ইসলাম খন্দকার, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার খসরু পারভেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তী।
সিন্ডিকেট সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “২০২৫ সালের ১৭ মার্চ গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘ আলোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই শেষে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেট এই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে যেন কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি না পান, আবার কোনো প্রকৃত অপরাধীও যেন পার পেয়ে না যান।”
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক তদন্ত বা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই সিন্ডিকেট প্রথমে একটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি ১৯ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। আজ মূলত সেই কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত রায় দিল সিন্ডিকেট।
তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) এবং কোষাধ্যক্ষের (ট্রেজারার) নেতিবাচক ভূমিকাও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। কিন্তু পূর্বে তাদের বিরুদ্ধে কোনো স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করা হয়নি। তাই আজকের সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের তিনজনের ভূমিকা তদন্তে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আরকে
