বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর হামলা

র‌্যাগিং করে উল্টো ‘মাস্তানি’ রাবির মার্কেটিং বিভাগের কয়েক শিক্ষার্থীর

র‌্যাগিং করে উল্টো ‘মাস্তানি’ রাবির মার্কেটিং বিভাগের কয়েক শিক্ষার্থীর

র‌্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণ করায় প্রক্টর ও বিভাগের সভাপতির উপস্থিতিতে তিন সাংবাদিক, রাকসু এজিএসসহ দুই নেতাকে মারধর করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় রবীন্দ্র ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

মারধরের শিকার হয়েছেন রাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন, ঢাকা পোস্টের জুবায়ের জিসান, দৈনিক মানবকণ্ঠের আবু বকর অনিক। এছাড়া রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির ও রাকসু বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্করও মারধরের শিকার হন।

অভিযুক্তরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল, সামি (২০২৪-২৫), ওমি (২০২২-২৩), আহমেদ রিয়াদ (২০২২-২৩), জিহাদ (২০১৯-২০), সামির (২০২৩-২৪) ও আতিক (২০১৯-২০)-সহ কয়েকজন শিক্ষার্থী।

সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধর করা অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্কেটিং বিভাগের তিনজন জুনিয়র শিক্ষার্থী এক সাংবাদিককে ফেসবুক মেসেঞ্জারে জানায়, ওই বিভাগের সিনিয়ররা তাদের সাথে মিট-আপের নামে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে এবং র‌্যাগ দেয়। আজকেই (১৮ জুন) রবীন্দ্র ভবনের পাশের সাইকেল গ্যারেজে তাদের সাথে বসবে বলে জানায় এবং প্রক্টরকে নিয়ে যেতে বলে তারা। পরে সাংবাদিক ও সহকারী প্রক্টর সেখানে যান এবং দেখেন জুনিয়র শিক্ষার্থীদের পাঁচটি সারিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে সিনিয়র কিছু শিক্ষার্থী। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন ওই সাংবাদিক। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ভিডিওতে র‍্যাগিং-এর কথা অস্বীকার করেন। তারপরই সাংবাদিকের উপর ক্ষিপ্ত হন সিনিয়র শিক্ষার্থীরা এবং তাকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা ও গালাগালি করেন। জুনিয়ররা বলেন, ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম নিয়ে তাদের এখানে ডেকেছেন সিনিয়ররা।’ কিন্তু এভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানোর কারণ জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেনি তারা। অপরদিকে র‌্যাগিংয়ে অভিযুক্ত সিনিয়ররা দাবি করেন, খেলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন তারা।

সাংবাদিককে ভিডিও ডিলিট করতে বারবার চাপ দিতে থাকে অভিযুক্ত ও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী। কিন্তু সাংবাদিক ভিডিও ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় দফায় দফায় তাকে তেড়ে মারতে আসেন ওই শিক্ষার্থীরা।

এক পর্যায়ে সেখানে আর কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত হন। তাদেরকে আটকে রাখা হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। এসময় অভিযুক্তরা নানা রকম হুমকি দিতে থাকে। মামলা করার ভয়ও দেখান তারা। এরপর সেখানে আসেন রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির ও রাকসু বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর। ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন তারা। তবে চেষ্টা করলেও কেও তাদের কথা শুনতে চাননি। উল্টো ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষিপ্ত হন।

পরবর্তীতে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান এবং মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বোরাক আলী ও ড. নুরুজ্জামান। তারা আসার পর বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করেন। দুপক্ষের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয় প্রক্টর অফিসে বসে সমাধান করা হবে। তবে সেখান থেকে কাউকে যেতে দিচ্ছিল না মার্কিটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

তবে প্রক্টর অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় হঠাৎ করেই আরেক সাংবাদিক আবু বকর অনিককে "আমাদের স্যারের সামনে হাঁটছিস?" বলেই মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল মুখে থাপ্পড় ও পেটে লাথি মারেন। এরপর সামি (২০২৪-২৫), ওমি (২০২২-২৩), আহমেদ রিয়াদ (২০২২-২৩), জিহাদ (২০১৯-২০), আতিক (২০১৯-২০) এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। তখন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ঝাঁপিয়ে পড়ে গোল হয়ে সাংবাদিকদের চড়-কিল-ঘুসি ও লাথি মারতে থাকেন। একই সময়ে সাংবাদিক মিশনের মুখে কয়েকটি থাপ্পড় মারেন, সাংবাদিক জুবায়ের জিসানকে মাথায় ও পিঠে ঘুসি ও লাথি মারেন এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে গালিগালাজ ও মারধর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে প্রক্টর দুজনকে তার গাড়িতে তুলে দেন এবং সেখান থেকে উদ্ধার করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসেন।

চলে আসার সময়েও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় এবং বারবার জোরে জোরে বলতে থাকে, “একদম মেরে সোজা করে ফেলব"। সাংবাদিক মিশনকে উদ্দেশ করে ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জিহাদ হুমকি দিয়ে বলেন, "ওরে ভালো মুখে বলেছিলাম ভিডিওটা ডিলিট করতে। ও শুনল না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে ওর অবস্থা খারাপ করে ছাড়ব।"

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মারুফ হোসেন মিশন বলেন, “আমি র‌্যাগিংয়ের খবর পেয়ে প্রক্টর স্যারকে কল করে জানাই। কিছুক্ষণ পরে একজন সহকারী প্রক্টর ঘটনাস্থলে চলে আসে এবং আমিও তার পিছু পিছু যাই। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমি ভিডিও ধারণ করি। সেখানে সারিবদ্ধভাবে জুনিয়রদের দাঁড় করিয়ে র‌্যাগ দিচ্ছিল সিনিয়ররা। আমাকে ভিডিও ডিলিট করতে চাপ দেয় ও গালাগালি করতে থাকে এবং ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় তেড়ে মারতে আসে কয়েকবার। এক পর্যায়ে আমাকে ও আমার ক্লাবের দুই সাংবাদিককে এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে চড়-কিল-ঘুষি মারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক পর্যায়ে প্রক্টর তার নিজের গাড়িতে করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

এ বিষয়ে জানতে কল দিলে মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল বলেন, “এটা আপনি ভুল তথ্য পেয়েছেন। একটা জটলা হয়েছিল, কথা-কাটাকাটি হয়েছে জাস্ট। সেখানে কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি।”

তবে একই বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী মাহির বলেন, “মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমি মারধর করিনি।”

এ বিষয়ে রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, “ওখানে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আমি থামাতে গেলে আমার ওপরও আঘাত আসে। আমরা রাকসুর পক্ষ থেকে প্রশাসন কাছে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানাই।”

এ বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম বোরাক আলী বলেন, “এ ঘটনার তো মিটমাট হয়ে গেছে। আপনি বিভাগে আসেন। সরাসরি কথা হবে। সরাসরি কথা বললে বেশি ইন্টারেক্টিভ হবে।”

মারধরের বিষয়ে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, “মারধরের অধিকার তাদেরকে কেউ দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কাউকে মারতে পারে না। এটা তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভঙ্গ করেছে। অবশ্যই তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “আমি নিজে সেখানে ছিলাম গতকাল সাংবাদিকদের যে ঘটনাটা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। প্রক্টর, সরকারি প্রক্টর এবং তার বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে আমরা সমাধান করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া ভিসি স্যার নিজে তার বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছে। তারপরও এরকম একটা ঘটনা আমাদের মধ্যে সংশয় জাগায়। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত অবশ্যই করা দরকার এবং যারা দোষী তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আমি বিশ্বাস করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটা করবে।”

র‌্যাগিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তাদের যেভাবে আমরা পেয়েছি তা র‌্যাগিংয়ের সকল সিম্পটম আছে।”

সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধরের ঘটনায় তিনি বলেন, “আমার সামনে সাংবাদিক ও রাকসুর নেতাদের মারধর করা হয়েছে। এটা খুবই জঘন্যতম অন্যায় হয়েছে। এটার বিষয়ে দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।”

জুবায়ের জিসান/এমটিআই

বিজ্ঞাপন