বিজ্ঞাপন

৭৪ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: গৌরবের মহিরুহ, চ্যালেঞ্জেরও সহযাত্রী

৭৪ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: গৌরবের মহিরুহ, চ্যালেঞ্জেরও সহযাত্রী

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার গৌরবময় পথচলার ৭৩ পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখন ৭৪ বছরে। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পরিসর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতিতে এগিয়ে চললেও তার দীর্ঘ পথচলায় জমেছে শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট আর পুরনো সেশনজটের জটিলতা। তবু পথচলার গল্পটা গর্বের, সম্ভাবনার, আর অবিরাম পরিবর্তনের।

১৯৫৩ সালে রোপণ করা বীজটি বতর্মানে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে।  

শহীদ ড. শামসুজ্জোহার স্মৃতি বিজড়িত দেশের শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যাপীঠের রয়েছে গৌরব-ঐতিহ্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজ। এই কলেজে আইন বিভাগসহ পোস্ট গ্রাজুয়েশন শ্রেণি চালু করা হলেও কিছুদিন পরেই সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তখন রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন অনুভূত হয়। ১৯৪৭ সালের দিকে রাজশাহীতে স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন ১৫ ছাত্রনেতা। পরে ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি ডেলিগেশন পাঠানো হয়। এভাবে একের পর এক আন্দালনের চাপে স্থানীয় আইন পরিষদ রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়। এই আন্দোলনে একাত্ম হন পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখ্শ।

অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন পাস হয়। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইতরাৎ হোসেন জুবেরীকে সঙ্গে নিয়ে মাদার বখ্শ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এরপর শুরু হয় রাবির পথচলা।

বর্তমানে ৩০৩ দশমিক ৮০ হেক্টর আয়তনের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১১৭৭ জন শিক্ষক ও ২০০০ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৩৩০ জন (বিদেশি শিক্ষার্থী ৫৮ জন)। এর মধ্যে ছাত্র ২৫ হাজার ৫৭৯ জন ও ছাত্রী ১২ হাজার ৫৫১ জন। বর্তমানে ১২ অনুষদের অধীনে বিভাগ রয়েছে ৫৯টি। বেড়েছে অবকাঠামো। ১২টি একাডেমিক ভবনসহ বর্তমানে রাবির ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১১টি ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৬টি। এছাড়া গবেষক ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ডরমেটরি।

সুদীর্ঘ সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়ে অনেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখেছেন। দীর্ঘ এ সময়ে রাবি তৈরি করেছে ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম, তাত্ত্বিক ও সমালোচক বদরুদ্দীন উমর, চলচ্চিত্র পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, মাসুম রেজা ও ক্রিকেটার আল আমিন হোসেনদের মতো অসংখ্য গুণীজনকে।

প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছরে ভাষা আন্দোলনের, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়টির ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গবেষণায় নতুন দিগন্ত, শতভাগ আবাসিকতা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এবং একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস গড়ে তোলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী, শতাধিক বিভাগ অ্যান্ড ইনস্টিটিউট এবং ১৭টি আবাসিক হল রয়েছে। তবে ৭৩ বছরের পথচলায়ও আবাসন সংকট, সীমিত গবেষণা বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। 

গবেষণায় আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন বলেন, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আবাসন সংকট। নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, সুষ্ঠু সিট বণ্টন, উন্নত গবেষণা পরিবেশ, আধুনিক গ্রন্থাগার, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তাদের।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার রিয়া বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন ও পরিচয়ের অংশ। আমরা চাই গবেষণা আরও প্রসার, আধুনিক শিক্ষা-সুবিধা, আবাসন সমস্যার সমাধান এবং একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে বিকশিত হবে।

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব ইসলাম বলেন, শতভাগ আবাসিকতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বৃদ্ধি ও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিট বাণিজ্য বন্ধ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সেশনজট শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা, গবেষণার মান উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি স্থাপন, আলোকায়ন বৃদ্ধি এবং গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৭৩ বছরের গৌরবময় পথচলা শেষে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী,কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।

এসএইচএ