বিজ্ঞাপন

জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলন: বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের আহ্বান

জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলন: বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের আহ্বান

জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দ্রুত বিচার, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘দ্বিতীয় জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিজেআর-২, ২০২৬)’।

রোববার (১৯ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিনেট ভবনে জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এর লিগ্যাসি: জবাবদিহি, সংস্কার ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’। এতে দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক, আইনজীবী, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক ও ছাত্র প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়নে বিচারহীনতার অবসান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং শহীদ ও আহতদের যথাযথ স্বীকৃতি জরুরি। একই সঙ্গে জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা সঠিকভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড থট (আরআইটি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), ইয়ুথ ফর বেটার ফিউচার সোসাইটি, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজিনা, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এবং সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের যৌথ উদ্যোগে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।

উদ্বোধনী বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবে শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেন, শহীদ পরিবারগুলোর প্রধান দাবি ন্যায়বিচার। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিতে আমরা হতাশ। দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আত্মত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, এটি পুরো জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের সক্ষমতায় দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাই হতাশাবাদী প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে জাতীয় পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

সম্মেলনে অনলাইনে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের সিরিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি হুমা খান এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ।

হুমা খান বলেন, জুলাই বিপ্লব দেখিয়েছে যে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে অস্ত্র ও সহিংসতা ছাড়াই পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।

জন ড্যানিলোভিচ বলেন, জুলাই-আগস্টের শহীদ, আহত ও তাদের পরিবারের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন আর ফিরে না আসে।

এ সময় বাংলাদেশের মানুষের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পক্ষে এবং জুলাই বিপ্লবে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হুমা খানকে ‘ফ্রেন্ডস অব জুলাই রেভল্যুশন’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. খ. ম. কবিরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম এবং ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা। তারা আইনের শাসন, বিচার ও জবাবদিহি, শিক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইদুল ইসলাম, বুয়েটের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, কাতারের হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. উসামা আল-আযমী এবং বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকিয়ান ফখরুল। তারা জুলাই বিপ্লবকে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি ও নাগরিক অধিকারের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করেন।

ছাত্র প্রতিনিধিদের পক্ষে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মো. আবু সাদিক কায়েম বলেন, জুলাইকে শুধু কয়েক সপ্তাহের আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এটি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন যাত্রার সূচনা।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য ও সম্মেলনের সহ-আয়োজক মো. মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ বলেন, জুলাই আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় অর্জন। জুলাইকে ঘিরে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।

দিনব্যাপী সম্মেলনের ১৫টি প্যানেলে নির্বাচিত ৮০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাপত্রগুলোতে জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, মানবাধিকার, গণমাধ্যম, সংবিধান ও প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।

প্যানেল আলোচনায় জুলাই বিপ্লবের একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা, শহীদ পরিবার ও আহতদের সাক্ষ্য সংরক্ষণ এবং বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামোর কার্যকর সংস্কারের প্রস্তাব উঠে আসে।

আরআইটির নির্বাহী পরিচালক ড. একরাম উদ্দীনের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়। সমাপনী ঘোষণায় জুলাই বিপ্লবকে জনগণের সম্মিলিত সংগ্রাম হিসেবে সংরক্ষণ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

এমএল/জেআই