বিজ্ঞাপন

গবেষণাপত্র প্রত্যাহারে শীর্ষে জাবি, সংকটে ভাবমূর্তি

গবেষণাপত্র প্রত্যাহারে শীর্ষে জাবি, সংকটে ভাবমূর্তি

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকী (জার্নাল) থেকে বৈজ্ঞানিক জালিয়াতি ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩২৫টি গবেষণাপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২টি গবেষণাপত্র বাতিল হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) গবেষকদের, যা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ও একাডেমিক সততাকে চরম প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের একারই ১০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক প্রকাশকেরা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

জাবির বিভিন্ন বিভাগ ও শিক্ষকদের গবেষণা বাতিল

অনুসন্ধানে দেখা যায়, শুধু পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও বহু বিভাগ ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের নাম আন্তর্জাতিক এই রিট্র্যাকশন তালিকায় এসেছে। 

শিক্ষকভিত্তিক সর্বোচ্চ রিট্র্যাকশন ঘটেছে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগে। অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের একক ও যৌথভাবে মোট ১০টি গবেষণাপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কবির উদ্দিনের যৌথভাবে ২টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে।

গণিত বিভাগের মোট ৪ জন শিক্ষকের গবেষণা নিবন্ধে রিট্র্যাকশন ঘটেছে। এর মধ্যে অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলমের ৩টি এবং সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের ২টি নিবন্ধ বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যাপক ড. আবেদা সুলতানা ও অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুমার পণ্ডিতের যৌথভাবে ১টি গবেষণা নিবন্ধ ‘জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্ট অ্যান্ড ফাজি সিস্টেমস’ থেকে বাতিল হয়।

পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সভাপতি ড. মো. সাখাওয়াত হোসেনের ২টি গবেষণাপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারকের ১টি এবং অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদারের ১টি গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সোহেলের ১টি এবং সহকারী অধ্যাপক নাফিসা নাওয়াল ইসলামের ১টি গবেষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুশফিক আনোয়ারের ১টি গবেষণা প্রত্যাহার করেছে স্প্রিঙ্গার। কারণ ছিল পিয়ার-রিভিউ কারসাজি, উদ্ধৃতি অনিয়ম ও অসাধু সম্পাদনা।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এ মামুনের ১টি গবেষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে স্প্রিঙ্গারের সাময়িকী থেকে। কারণ হিসেবে গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ত্রুটি উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামের ১টি নিবন্ধ তালিকাভুক্ত রয়েছে।

রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এনামুল হকের ১টি গবেষণা বাতিল করেছে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (এসিএস)। উপাত্ত ও ফলাফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল থাকায় এটি প্রত্যাহার হয়।

ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক ড. কে এম জাহিদুল ইসলামের ১টি গবেষণা বাতিল করেছে এলসেভিয়ার। কারণ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংযুক্তি ও লেখকত্ব সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন। পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের ১টি নিবন্ধ বাতিল হয়েছে। ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত হোসেনের ১টি নিবন্ধ ‘ইন প্রেস’ সংস্করণ পর্যায়ে প্রত্যাহার হয়।

এ ছাড়াও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বায়োটেকনোলজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. নাজমুল ইসলাম প্রত্যয়, পাবলিক হেলথ বিভাগের মো. ইস্তিয়ার রহমান, ফার্মেসি বিভাগের মিনহাজ আবদুল্লাহ আল মুইদ ও প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের জাহিদুর রহিমের নামযুক্ত নিবন্ধও পেপার মিল, অসাধু পিয়ার রিভিউ ও উপাত্ত অনিয়মের অভিযোগে প্রত্যাহৃত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক উপাত্তভাণ্ডার ও প্রকাশনা তদারকি সংস্থা ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’- এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্প্রিঙ্গার (Springer), এলসেভিয়ার (Elsevier), ওয়াইলি (Wiley), প্লস ওয়ান (PLOS ONE) ও আইইইই (IEEE)-এর মতো বিশ্বখ্যাত সাময়িকী থেকে জাবির শিক্ষক ও গবেষকদের যুক্ত থাকা এসব গবেষণা প্রত্যাহার করা হয়। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভুয়া বিষয়বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (পিয়ার রিভিউ), উদ্ধৃতি জালিয়াতি, তথ্যের অনিয়ম ও বিকৃতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার-উৎপাদিত বিষয়বস্তুর ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ‘পেপার মিল’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানহীন গবেষণাপত্র তৈরির অভিযোগ।

অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সুন্দরবনের পশুর নদীর প্লাস্টিক দূষণ, চা-পাতা ও কোভিডের ইকোটক্সিকোলজি সংক্রান্ত একাধিক গবেষণায় তথ্য ও পিয়ার রিভিউ অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রকাশকেরা এসব পদক্ষেপ নেন। 

এ বিষয়ে জাবি শিক্ষক অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা আমি সঠিকভাবে জানি না। তবে এই ঘটনার পর আমি সতর্ক হয়েছি এবং বিষয়টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’

নীরব প্রশাসন, ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থী

অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্পমাত্রায় হলেও তদন্ত ও প্রশাসনিক সতর্কতার নজির থাকলেও জাবিতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। একের পর এক গবেষণাপত্র বাতিলের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটার পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নীতিগত মান বজায় রাখা বা জালিয়াতি রোধে কোনো একাডেমিক সততা নীতিমালা (একাডেমিক ইন্টেগ্রিটি পলিসি) না থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছেন জড়িতরা।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় যদি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে ইউজিসি নিজ উদ্যোগে তদন্ত কমিটি গঠন করে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রকাশনা জালিয়াতি নিয়ে যা বললেন বিশিষ্ট গবেষক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও দেশখ্যাত গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. মোহাম্মদ কবিরুল বাশার প্রকাশনার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, র‍্যাংকিং বা উদ্ধৃতির পেছনে ছুটতে গিয়ে গুণগত মান বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ভুয়া বা প্রত্যাহৃত প্রকাশনা উল্টো মেধাবী ও প্রকৃত গবেষকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ক্ষুণ্ন করে।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে তিনি মনে করেন, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত এবং গবেষণার নামে এই অনৈতিক দৌরাত্ম্য এখনই বন্ধ করা দরকার।

মুহাম্মদ সাব্বির/আরএআর