জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার, প্রক্টরের অপসারণ, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ক্যাম্পাসে নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। একই সঙ্গে হস্তান্তর করেছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার( ৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন জকসুর নেতারা।
স্মারকলিপিতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের অধিকার লঙ্ঘন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ৯ দফা দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে জকসু হামলার ঘটনায় প্রক্টরের অপসারণ ও তদন্তের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা, হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা, বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, ক্যাম্পাসে বহিরাগত ও অছাত্রদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত, আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহন, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, হাসপাতালে আহতদের দেখতে না যাওয়ার দায়ে সংশ্লিষ্টদের অপসারণ এবং অছাত্রদের রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠাসহ ৯ দফা দাবি জানায়।
স্মারকলিপিতে জকসুর উপস্থাপিত দাবিগুলো হলো- শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরং ছাত্রদলকে নির্দেশ দিয়ে হামলা চালানোর অপরাধে অবিলম্বে জবি প্রক্টরকে পদত্যাগ করতে হবে এবং একই সঙ্গে এই অপরাধের জন্য তদন্তপূর্বক প্রক্টরের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, হামলায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে-সে ছাত্র হোক বা বহিরাগত-চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে স্থায়ী বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে, ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে এবং হাসপাতালে সংঘটিত হামলার ঘটনায় জড়িত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত ও অছাত্রদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ঘটনার সম্পূর্ণ ও অবিকৃত সিসিটিভি ফুটেজ জকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে এবং একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। হামলায় আহত সব শিক্ষার্থীর চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহন করতে হবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জকসুর জিএস আবদুল আলীম আরিফসহ প্রায় ৫০ অধিক আহতদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষক কিংবা কর্মকর্তা হাসপাতালে দেখতে না যাওয়ার দায়ে সংশ্লিষ্টদের অপসারণ করতে হবে। অছাত্রদের অসুস্থ রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে রিয়াজুল বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িত বহিরাগত, অছাত্র ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করতে হবে। বহিরাগতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে এবং ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) তৈরি করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের জন্য তিন দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এই তিন দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসনকে তাদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।
এছাড়া স্মারকলিপিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, সাত একর জমিতে ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক মো. নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করেন। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা তাদের প্ল্যাকার্ড ছিনিয়ে নিয়ে অডিটোরিয়াম থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, পরে শিক্ষার্থীরা শহীদ ইকরামুল হক সাজিদ ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফসহ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংহতি জানান।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, একপর্যায়ে প্রক্টর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, "তোমরা যদি আন্দোলন প্রত্যাহার না করো, তাহলে সিন ক্রিয়েট করে তোমাদের এখান থেকে উঠিয়ে দেওয়া হবে।" এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে নারী শিক্ষার্থী, জকসুর প্রতিনিধি, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। হামলায় দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার, হ্যান্ডমাইক ভাঙচুর এবং ক্যাম্পাসজুড়ে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগও করা হয়।
জকসুর দাবি, হামলায় জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, নির্বাহী সদস্য আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী আহত হন। দীর্ঘ সময় হামলা চললেও প্রশাসন তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে জকসু জানায়, তিন কার্যদিবসের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।
বিআরইউ
