ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বিভিন্ন বিভাগে নবীন শিক্ষার্থীদের ম্যানার শেখানোর নামে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্ট গণনা, নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনের ছাদে ওঠানো, গভীর রাতে আটকে রাখা, ময়লা পানি মুখে নিতে বাধ্য করা এবং জোরপূর্বক ধূমপান করানোর মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হলেও তা তোয়াক্কা না করেই চলছে এসব অপকর্ম। নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা অভিযোগ না করার জন্য নানা হুমকির মুখে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলেও অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আইন, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ফার্মেসি ও লোকপ্রশাসনসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। ট্যুরিজম বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের ময়লা পানি পান করানো, দশ ধরনের হাসি, জোরপূর্বক নাচানো, নবনির্মিত ১০ তলা ভবনের ছাদে ওঠা ও বিভিন্ন জড়পদার্থকে ৭০/৮০ বার পরিচয় দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে বিভাগটির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সানি নেহালী, সানাউল করিম, মেহেদী হাসান, রিয়াদ হাসান, সঞ্জীব, প্রীতম, হাসিব, সারা, নির্ঝরা ও ফাইজা, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের নাহিদ এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আমিরুল অনি ও আব্দুল কাইয়ুমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। একই বিভাগে এক নবীন নারী শিক্ষার্থীকে ফেক আইডি দিয়ে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ এসেছে।
এ ছাড়া অভিযোগ উঠেছে, ট্যুরিজমের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমিরুল অনি ছাত্রদলের পরিচয়ে এক শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে বিষয়গুলো প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেন। কথা না শুনলে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা শঙ্কা হতে পারে বলেও হুমকি দেন।
লোকপ্রশাসন বিভাগে ওরিয়েন্টেশনের পর থেকে ম্যানার শেখানোর নামে জুনিয়রদের গালিগালাজ ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে চেক করার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে আল-ফিকহ বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষেও তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নবীন শিক্ষার্থীকে ধূমপানে জোর করা ও গভীর রাত পর্যন্ত আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। বিভাগটির একই বর্ষের সাজ্জাদ আলীর বিরুদ্ধে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের এক নবীন ছাত্রীকে পরিচয়ের নামে অনলাইনে হেনস্তার অভিযোগ এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে র্যাগিংয়ের শিকার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ওরিয়েন্টেশনের পর থেকেই ম্যানার শেখাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে আটকে রেখে হয়রানি করা হয়। কখনো গভীর রাত পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। ট্যুরিজমের সানাউল করিম এক নবীন শিক্ষার্থীর মুখে ময়লা পানি নিয়ে অপরজনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ১০ ধরনের হাসি দিতে বাধ্য করেন। একই বিভাগের অন্যরা ক্যাম্পাস পার্শ্ববর্তী শ্রীরামপুর নিয়েও নবীনদের বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতন করেন। এ ছাড়া ট্যুরিজমের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমিরুল অনি ছাত্রদলের পরিচয়ে এক শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে অভিযোগ না দিতে চাপ দেন। কথা না শুনলে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা শঙ্কা হতে পারে বলেও হুমকি দেন।
অভিযুক্ত সানি নেহালী অভিযোগের বিষয়ে জানান, এসব কার্যক্রমে তিনি একা জড়িত ছিলেন না। একই ব্যাচের প্রায় সবাই বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। নবীন শিক্ষার্থীদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ করানো হতো। আমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। সবাই করেছে, কিন্তু নাম এসেছে শুধু আমার।
আরেক অভিযুক্ত সানাউল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভাগের সব শিক্ষক মিলে তদন্ত করে একটি রিপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, র্যাগিংয়ের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। বিভাগগুলোর সভাপতিকে তদন্তের জন্য বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ট্যুরিজম বিভাগের রিপোর্ট এসেছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, র্যাগিং ইস্যুতে বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও ডিনদের কাছে নোটিশ পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাওয়াজুর রহমান/এএমকে
