বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন নাসির উদ্দিন নাসির।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া সেই পোস্টে তিনি ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন থেকে শুরু করে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন, বন্যার সময় ত্রাণ কার্যক্রম, ছাত্রদলের সাংগঠনিক বিস্তার এবং ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার আক্ষেপ সবকিছুই খোলামেলা ভাষায় তুলে ধরেছেন।
পোস্টে নাসির লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে।’
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাসির জানান, ‘ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসময়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।’
তিনি লেখেন, তখন হয়ত ভাবিনি, একদিন এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার দুর্লভ সুযোগ আমার জীবনে আসবে। কিন্তু রাজনীতি কখনো শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; এটি মানুষের জন্য কাজ করার, সংকটে পাশে দাঁড়ানোর এবং নিজের বিশ্বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার এক দীর্ঘ যাত্রা।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিয়ে বিস্তর স্মৃতিচারণ
পোস্টের আলোচিত অংশটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে। তিনি দাবি করেন, সেই উত্তাল সময়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার ভাষায়, ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্ব অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের অনেকের নাম হয়ত ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না, কিন্তু একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস কখনো শুধু কয়েকজন মানুষের নাম লিখে শেষ হয়ে যায় না।

নাহিদ-আসিফ-হাসনাত-সারজিসদের নিয়ে আক্ষেপ
আন্দোলনের সময় নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন নাসির।
তিনি লিখেছেন, আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয়ত ছাত্রদলের অবদান তারা সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেনি; কিন্তু আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
ডাকসু নির্বাচনের ফল নিয়ে আত্মসমালোচনা
পোস্টের সবচেয়ে আত্মসমালোচনামূলক অংশটি ছাত্রসংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে। তিনি স্বীকার করেন, প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া তাকে এখনো ভাবায়।
দীর্ঘ স্ট্যাটাসে নাসির লিখেছেন, ‘কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল, কোথায় আরও ভালো করা যেত- এসব প্রশ্ন নিজের কাছে করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রদল এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, আরও গ্রহণযোগ্য এবং আরও সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে।’
খালেদা জিয়ার নির্দেশে ফেনীতে যাওয়া
জুলাই আন্দোলনের পর নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। নাসির দাবি করেন, তখন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে দ্রুত বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন এবং পরে তারেক রহমান ফোন করে একই নির্দেশনা দেন।
তিনি লেখেন, আমরা তখন বুঝেছি, রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
মব সংস্কৃতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তিনি বলেন, চারদিকে নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিল না। সব প্রোপাগান্ডা কাটিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা ছিল প্রতিনিয়ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
দায়িত্ব পালনকালে প্রায় দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি কোনো একজনের কৃতিত্ব নয়; বরং সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন তিনি। লিখেছেন, এই অপূর্ণতার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
নতুন নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা
দায়িত্ব ছাড়লেও ছাত্রদল থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। তার ভাষায়, আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়। পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে নয়, সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়।
তিনি আরও লিখেছেন, আগামী দিনে ছাত্রদলে যারাই নেতৃত্বে আসবেন, তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, আরও সংগঠিত এবং আরও গতিশীল হবে- এ বিশ্বাস আমার আছে।
শেষের আবেগঘন আবেদন
সহযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি লিখেছেন, কোনো আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকি, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকে, কারও প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়ে থাকি, তাহলে আমাকে ক্ষমা করবেন। পরিবার, বন্ধু এবং সাংবাদিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। সমালোচনাকেও প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করে নাসির লেখেন, তাদের সমালোচনাও আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
পোস্টের একেবারে শেষাংশে তিনি লেখেন, জীবনের কোনো এক প্রান্তে গিয়ে সুখময়, সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখতে পাব, সে স্বপ্ন দেখি নিরন্তর। আমার পরিচয়-প্রতীম ছাত্রদল সেই বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে থাকুক অবিচল, এই সুন্দরতর প্রত্যাশায় শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
এজেডআর/এমএন
