গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ ছয় দফা দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সভাপতিত্বে এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ডা. হারুন অর রশিদ, গবেষক ও শিক্ষক মাহা মির্জা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা।
সমাবেশ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—অবিলম্বে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করা; রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ও জ্বালানি তেল আমদানি বেসরকারিকরণের নামে লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া বন্ধ করা; অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর রাখা; দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করা; মবসন্ত্রাস বন্ধ করা; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং শ্রমিক ছাঁটাই ও হকার উচ্ছেদ বন্ধ করা।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, ফাহমিদুল হক, চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান, সংগীতশিল্পী অরূপ রাহী, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, এনপিএর নেতা বাকি বিল্লাহ, অনিক রায়, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের ঢাকা মহানগরের সম্পাদক ইকবাল কবীর, বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক মাসুদ রানা, লেখক ও গবেষক মাহতাবউদ্দীন আহমেদসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা।
ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ধরনের জেনেরিক ওষুধ রয়েছে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের একটি আদেশের কারণে সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে বাকি ১ হাজার ২০০-এর বেশি ওষুধের দাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীকেই বহন করতে হয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এটি সর্বোচ্চ। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। দরিদ্র মানুষের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
গবেষক ও শিক্ষক মাহা মির্জা বলেন, বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হওয়ার মধ্যেই আগের সময়ের বিভিন্ন নীতির পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। বাপেক্সকে দিয়ে একটি জরিপ করাতে যেখানে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে একই কাজ বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকায় করানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মাহা মির্জার ভাষ্য, গত কয়েক মাসে দেশে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে বুলডোজার দিয়ে মানুষের ছোট পুঁজি ও জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা হলেও সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রাথমিকভাবে সরবরাহের উৎস বাড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলে পরবর্তী সময়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব জনস্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে লোকসান নিয়েও সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাজারের বড় অংশ দেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের জনস্বার্থের দায় নিশ্চিত করা না গেলে তা জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। তার অভিযোগ, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে পোলট্রি, কৃষি, ওষুধসহ বিভিন্ন খাতে তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘পূর্বের মতোই এখনো আমাদের দেশের জ্বালানি খাতকে নিয়ে জনস্বার্থবিরোধী অপতৎপরতা চলছে। এখন আবার তারা ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পাঁয়তারা শুরু করেছে। গত ছয় মাসে তারা অনেক কাজ করতে পারত, যদি তাদের মাথায় জনগণের স্বার্থের কথা থাকত। কিন্তু জনবান্ধব কাজে এই ছয় মাসে এই সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে না।’
এজেডআর/এসএইচএ
