ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল দ্রুত ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। আগামী ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণার জন্য উপাচার্যের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে ডাকসু।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ডাকসু সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ডাকসুর পঞ্চম কার্যনির্বাহী সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানান, ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রাথমিকভাবে একটি সেল গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুতই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদের সঞ্চালনায় সভায় ভিপি সাদিক কায়েম, এজিএস মহিউদ্দিন খান, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেনসহ নির্বাচিত সম্পাদকমণ্ডলী ও কার্যনির্বাহী সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণ, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, আবাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, অ্যাকাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডাকসুর পরবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে সভায় আগামী ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণার দাবি জানানো হয়। উপাচার্য জানান, নির্বাচনসংক্রান্ত প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে একটি সেল গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত তফসিল ঘোষণা করা হবে।
এ ছাড়া, শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর অগ্রগতি শিক্ষার্থীদের জানাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিস্তারিত তথ্য নোটিশ আকারে প্রকাশের আহ্বান জানায় ডাকসু।
শাহবাগ থানায় ডাকসু নেতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। আগামী সোমবারের (২৪ আগস্ট) মধ্যে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভায় জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়। উপাচার্য জানান, কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডাকসুর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেনকে প্রধান করে একটি অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সভায় কার্জন হলে ক্যান্টিন চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে উপাচার্য জানান। পাশাপাশি মোকাররম ভবন ও অ্যানেক্স ভবনে ক্যান্টিন স্থাপনের জন্য জায়গা বরাদ্দের বিষয়ে স্পেস কমিটির সভা দ্রুত আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফুড সেফটি কমিটি গঠনেরও নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন উপাচার্য। কমিটিতে পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি এবং ডাকসুর প্রতিনিধিদের রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কমিটি সক্রিয় করা, ছাত্রীদের নিরাপত্তায় ডিজিটাল গেট ও এন্ট্রি-এক্সিট ব্যবস্থা চালু, ক্যাম্পাসে কার্যকর পুলিশিং ব্যবস্থা, রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবেশদ্বারে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়।
শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ওয়ান ডিইউ অ্যাপ’ চালুর প্রস্তাবও সভায় গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবিত অ্যাপে হলের সিট বণ্টন ও পেমেন্ট, অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল, কোর্স, শিক্ষক মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবাসহ নিয়মিত কার্যক্রম যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের ভোটে ‘টিচার হু ইন্সপায়ার্ড মি’ থিমে বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড চালু, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজেবিলিটি সাপোর্ট সেল, প্রতিটি হলে আইটি ও ক্যারিয়ার সেন্টার, টিচিং ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চালু এবং হলে স্বচ্ছ সিট বণ্টন নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও আলোচনা হয়।
সভায় ডাকসু সংগ্রহশালা চলতি মাসের মধ্যে সংস্কার ও উদ্বোধন, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারে বরাদ্দকৃত দুই কোটি টাকা ব্যবহারের উদ্যোগ, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত জিমনেসিয়াম চলতি মাসে উদ্বোধন এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ই-লাইব্রেরি সংস্কারের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম ধাপে আবাসিক হলগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় ডাকসু।
এ ছাড়া, ক্যাম্পাসে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু, কলা ভবন ও বিজনেস ফ্যাকাল্টির লিফট সংস্কার, হলপাড়ায় ফার্মেসি ও সাইকেল গ্যারেজ স্থাপন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে পরমাণু শক্তি কমিশন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়।
তফসিল ঘোষণার বিষয়ে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে যাচ্ছি, আলোচনা করছি, সিদ্ধান্তও হচ্ছে; কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অযথা দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে প্রশাসনিক গাফিলতি বা অসহযোগিতা আমরা মেনে নেব না।
সাদিক কায়েম আরও বলেন, আমরা চাই, সিদ্ধান্ত শুধু সভার কার্যবিবরণীতেই সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবে রূপ নিক। আমরা সংঘাত চাই না, প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান করতে চাই। কিন্তু সহযোগিতা একতরফা হতে পারে না। প্রশাসন যদি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তাহলে ডাকসু সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। আর যদি বারবার আশ্বাস দিয়েও বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে।
এজেডআর/এসএএস
