রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব ও বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব ভাগাভাগি, মিয়ানমারের জবাবদিহি এবং প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চ্যালেঞ্জ : আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ (সিজিএস) ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের হিট (HEAT) প্রকল্প যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
সেমিনারে দুই শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষাবিদ, পররাষ্ট্রসেবা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাতের প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
সেমিনারের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন সিজিএসের পরিচালক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের হিট (HEAT) সাব-প্রজেক্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ। স্বাগত বক্তব্য দেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
সেমিনারের প্রথম পর্বে ‘মানবিকতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য’ বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা তরুণ প্রতিনিধিরা ভার্চুয়ালি অংশ নেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দা রোজানা রশীদ, ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান টুন খিন এবং মালয়েশিয়ান অ্যাডভাইজরি গ্রুপ অন মিয়ানমারের হেড অব সেক্রেটারিয়েট লিলিয়ানে ফ্যান আলোচনায় অংশ নেন। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাহাব এনাম খান।
দ্বিতীয় পর্বে ‘আলোচনায় আবারও প্রত্যাবাসনকে ফিরিয়ে আনা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন মিয়ানমার সংঘাত বিশ্লেষক আশফাক রনি, মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকারের মানবাধিকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী ইউ অং কিয়াও মো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ উইংয়ের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান, মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাশেদ উজ জামান।
সেমিনারের সমাপনী অধিবেশনে আলোচনার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন সিজিএসের পরিচালক ও হিট সাব-প্রজেক্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ। সমাপনীতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম।
আয়োজকরা জানান, বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের প্রত্যাবাসন কার্যকরভাবে শুরু করা সম্ভব হয়নি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের ফলে প্রত্যাবাসন আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ীত্বে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রভাব, বাংলাদেশের ওপর মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ এবং প্রত্যাবাসনকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
সেমিনারে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিপীড়ন ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। মানবিক মূল্যবোধ থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অভিন্ন লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ এখনো কঠিন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংহতি ও সমর্থনের কথা বললেও অনেক সময় মানবিক প্রয়োজনের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
উপাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, দেশের সম্পদ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ মোকাবিলা করা এবং রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় পরিবেশগত ক্ষতি কমানো। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও গঠনমূলক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক ইস্যু নয়; এটি মানব নিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ তখন তাদের আশ্রয় দেয়। কিন্তু প্রায় নয় বছর পরও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
প্রধান অতিথির দাবি, বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ক্যাম্পগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ক্যাম্পে একটি প্রজন্ম পরিচয় ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ছাড়া বেড়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উগ্রবাদ ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির কারণে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ আরও জটিল হয়েছে। তার মতে, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে এই জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই নিজের স্বার্থ রক্ষা করে এগোতে হবে।
এজেডআর/জেডএস
