বিজ্ঞাপন

জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাস : নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ নিয়ে শঙ্কা

জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাস : নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ নিয়ে শঙ্কা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির মুখে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বর্তমানে সেনাবাহিনীর ২৫ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের অধীনে প্রকল্পের কাজ চলমান। তবে, প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করা, সঠিক লেভেলে বালু ভরাট না হওয়া এবং সময়মতো অর্থ বরাদ্দের অভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।

‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন: ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রথম ধাপে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে সীমানা প্রাচীর প্যাকেজ-২, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃরাস্তা, পেরিফেরাল সারফেস ড্রেন, দুটি গভীর নলকূপ স্থাপন, বৈদ্যুতিক কাজ, সাবস্টেশন নির্মাণ, লেকের স্লোপ প্রটেকশন, বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান হল নির্মাণ, কনসালটেন্সি এবং সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের উন্নয়নকাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলমান থাকলেও অধিগ্রহণ করা জমিতে অননুমোদিত স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়া এবং সঠিক লেভেলে বালু ভরাট না করায় অগ্রগতি থমকে গেছে। বিশেষ করে সারফেস ড্রেন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও লেকের স্লোপ প্রটেকশনের কাজ চরম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রথম ধাপের প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে

কাজের বর্তমান অবস্থা ও অগ্রগতি

প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের কাজের অগ্রগতি নিয়ে সেনাবাহিনীর মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমানা প্রাচীর প্যাকেজ-২-এর কাজ ৮ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ১০ শতাংশ, পেরিফেরাল সারফেস ড্রেন ৮ শতাংশ, দুটি গভীর নলকূপ স্থাপন ৫৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, বৈদ্যুতিক কাজ ২ শতাংশ, লেকের স্লোপ প্রটেকশন ৩৬ শতাংশ, বাণী ভবন ৪৫ শতাংশ, ড. হাবিবুর রহমান হল ৩৬ শতাংশ, বহিঃরাস্তা ৪০ শতাংশ এবং সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, সাবস্টেশন নির্মাণের অগ্রগতি এখনও শূন্য শতাংশ।

dhakapost

সরেজমিনে দেখা গেছে, সীমানা প্রাচীর প্যাকেজ-২, বৈদ্যুতিক কাজ ও সাবস্টেশন নির্মাণের দৃশ্যমান কাজ এখনও শুরু হয়নি। অভ্যন্তরীণ রাস্তার তিনটি সেকশনের একটিতে মাটি সমতলের (সারফেস লেভেলিং) কাজ চলছে। কেরানীগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে নতুন ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক পর্যন্ত ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বহিঃরাস্তার সাব-বেইজের দ্বিতীয় স্তর পর্যন্ত কাজ চলমান রয়েছে এবং কিছু অংশে কংক্রিট ঢালা হয়েছে। তবে, প্রয়োজনীয় ভূমি প্রস্তুত না থাকায় অন্যান্য অংশে কাজের গতি থমকে আছে।

প্রয়োজনীয় ফান্ড বা অর্থ বরাদ্দের অভাবে সীমানা প্রাচীর, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলে সেনাবাহিনী ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেনাবাহিনীর এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে, সরকারি আইনি বিধি অনুযায়ী টেন্ডার ও চুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন ছাড়া আগেভাগে কোনো অর্থ বরাদ্দ বা অগ্রিম পেমেন্ট দেওয়ার সুযোগ নেই

এছাড়া, ক্যাম্পাসের চারপাশে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সারফেস ড্রেন নির্মাণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৮০০ মিটার কাজ শেষ হয়েছে। দুই কিলোমিটার দীর্ঘ লেকের স্লোপ প্রটেকশনের ক্ষেত্রে প্রি-কাস্ট পাইল ও ব্লক তৈরির কাজ চললেও বর্ষার পানি না শুকানোয় লেকের অভ্যন্তরে মূল পাইলিংয়ের কাজ শুরু করা যায়নি।

অন্যদিকে, ছয়তলা বাণী ভবনের দ্বিতীয় তলার ছাদ এবং ড. হাবিবুর রহমান হলের প্রথম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। তবে, এই দুটি ভবনের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মো. ইফতেখার আলম জানান, অক্টোবরের ১৩ তারিখে সাইট হস্তান্তর করে দুর্গম একটি জায়গায় এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করা কোনো প্রকৌশলীই বিশ্বাস করবেন না। আশা করছি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে দুটি কাজ সম্পন্ন হবে। সামগ্রিকভাবে ২-৩ মাস বাড়তি সময় লাগতে পারে।

dhakapost

অননুমোদিত স্থাপনা ও বালু ভরাটে জটিলতা

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য প্রায় ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও সীমানা ঘেঁষে দ্বিতল ভবন ও টিনশেড ঘরসহ বেশকিছু অননুমোদিত স্থাপনা রয়ে গেছে। ফলে সারফেস ড্রেন তৈরির কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ড্রেন তৈরির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আলম ল্যান্ড ফাউন্ডেশন’-এর প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মাটি খনন ও বেইজ কাস্টিংয়ের কাজ শেষ হলেও সীমানা প্রাচীর ও বালু ভরাট না হওয়া এবং কিছু স্থাপনা থেকে যাওয়ায় ড্রেনের কাজ আটকে আছে। স্থাপনাগুলো সরিয়ে সারফেস লেভেলিং করা হলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’

প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মো. ইফতেখার আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে লেভেলে স্যান্ড ফিল করার কথা, বহু জায়গায় তার চেয়ে ১ থেকে ২ মিটার নিচে রয়েছে। প্রয়োজনীয় সাইট ডেভেলপমেন্ট না হওয়ায় আমি সারফেস ড্রেন ও রাস্তার কাজ শুরু করতে পারছি না। ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে সব প্রস্তুতি থাকলেও সাইট বুঝিয়ে না দিলে কাজ করব কীভাবে? এভাবে কাজ শেষ না হলে অযথা আমাদের দোষারোপ করা ভুল ব্লেম গেম হবে।’

তবে বালু ভরাট ও সারফেস লেভেলিংয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। আশা করি সেনাবাহিনীর প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যেই সমাধান সম্ভব হবে।’

বরাদ্দ সংকট নিয়ে বিতর্ক

অর্থ বরাদ্দের অভাবে সীমানা প্রাচীর, বৈদ্যুতিক কাজ ও সাবস্টেশন নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলে সেনাবাহিনী দাবি করেছে। লে. কর্নেল ইফতেখার আলম বলেন, ‘ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিল কেন ফান্ডের টাকা দাবি করা হয়নি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার উপযুক্ত জবাব দিতে পারেনি। আমরা বরাদ্দ চাইলে নানা অজুহাত দেওয়া হয়, যা কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।’

তবে, সেনাবাহিনীর এমন দাবি নাকচ করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘টেন্ডার হওয়ার আগে কোনো কাজে সরাসরি অর্থ বরাদ্দ বা অগ্রিম পেমেন্ট দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রক্রিয়ানুযায়ী টেন্ডার মূল্যায়ন ও ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পরই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তারা সীমানা প্রাচীরের গেট ও সংযোগ প্রাচীরের কাজ এখনও শুরুই করেনি।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য

প্রকল্পের অননুমোদিত স্থাপনা অপসারণ এবং বালু ভরাট করে জমি সমতলের (সারফেস লেভেলিং) কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী জানান, ‘মুজাহিদনগর সংলগ্ন এলাকায় কিছু স্থাপনা নিয়ে আইনি জটিলতা থাকায় চাইলেই সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। তবে, সংশ্লিষ্টদের স্থাপনাগুলো অপসারণের জন্য ইতোমধ্যেই চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বালু ভরাট ও জমি সমতলের কাজও দ্রুত গতিতে চলছে।’

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সেনাবাহিনীর চাহিদা ও প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যেই অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং জমি সমতলের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে, সীমানা প্রাচীর প্যাকেজ-২-এর কাজ এবং লেকের স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ বিলম্বের বিষয়ে সেনাবাহিনীর দেওয়া ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এমএআর