বিজ্ঞাপন

গুমের ভয়াবহতা বুঝতে না পারলে কার্যকর আইন করা যাবে না : তাজুল ইসলাম

গুমের ভয়াবহতা বুঝতে না পারলে কার্যকর আইন করা যাবে না : তাজুল ইসলাম

বাংলাদেশে গুমের ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা উপলব্ধি না করলে গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তার দাবি, গুমের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং বন্দিদের হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আরসি মজুমদার মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘শুনতে কী পাও?’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে এসব কথা বলেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, গুমের ঘটনায় তদন্তের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাকে অসংখ্য ভয়াবহ ঘটনার তথ্য জানতে হয়েছে। এসব ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরা জরুরি, কারণ গুমের প্রকৃত ভয়াবহতা মানুষ উপলব্ধি না করলে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইন ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে না।

গুমের একটি তদন্তের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি বাহিনীর সদস্য হিসেবে গুমের ঘটনায় যুক্ত থাকা এক ব্যক্তি প্রথমে কয়েক দিন কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। পরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি জানান, আগে যা বলেছেন তা ছিল মাত্র এক শতাংশ। এরপর তিনি হত্যার বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন। ওই বর্ণনা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তা লিখতে গিয়ে তদন্ত দলের টাইপিস্টও একপর্যায়ে আর লিখতে পারছিলেন না।

সাবেক এই প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে গোপন আটককেন্দ্র থেকে বন্দিদের তুলে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হতো। পরে তাদের গুলি করে হত্যা করে পেট কেটে ভারী বস্তু বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। কাঁচপুর ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের হত্যার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে বলে তিনি জানান।

পদ্মা নদীতে তিন তরুণকে হত্যার একটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন তাজুল ইসলাম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তা তাকে জানান, ২০১১ সালে একটি অভিযানে তিন তরুণ বন্দিকে স্পিডবোটে করে নদীতে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে একজনকে গুলি করে এবং আরেকজনকে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়। তৃতীয় ব্যক্তিকেও গুলি করে হত্যার পর তাদের মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে ওই কর্মকর্তার সাক্ষ্যে উঠে এসেছে।

গুম প্রতিরোধে প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করে তাজুল ইসলাম বলেন, গুমের ঘটনায় কোন বাহিনী জড়িত ছিল, তা নির্ধারণ করাই অনেক সময় কঠিন। কারণ অপহরণের সময় জড়িত ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় গোপন করত এবং এক বাহিনীর পরিচয়ে অন্য বাহিনীর সদস্যরাও অভিযান চালাত বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে কোনো বাহিনীকে বাদ দিয়ে অন্য বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত-ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কার্যকর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তাজুল ইসলাম বলেন, কোনো বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আইন করা হলে তা ভবিষ্যতে আরও গুরুতর অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গুমের ঘটনা ব্যাপক ও পরিকল্পিত রূপ নিলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গুমের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে অবস্থান নিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে আবার গুম ও ভয়ভীতির পরিবেশে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়; জীবনের নিরাপত্তা এবং গুম হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্ত থাকাও স্বাধীনতার অংশ। বাংলাদেশকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন ও বিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।   

এজেডআর/আরএফ