জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যোগে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫৩তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষ্যে জন্মাষ্টমী উৎসব-১৪৩৩ পালন করা হয়েছে। পূজা, শ্রীশ্রীজন্মাষ্টমী শোভাযাত্রা, ধর্মীয় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের পাশে এ উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
সকালে পূজা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমী উৎসবের সূচনা হয়। পরে শ্রীশ্রীজন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে শুরু হয়ে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া পার্ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসে এবং মুক্তমঞ্চের সামনে এসে শেষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন।
শোভাযাত্রা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের সামনে ধর্মীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন বলেন, হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হলেও তার জীবন, দর্শন ও শিক্ষা আজও সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন— মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার বংশপরিচয়ে নয়; বরং তার কর্মের মধ্য দিয়েই তার মর্যাদা ও অবস্থান নির্ধারিত হয়। তিনি সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাই শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ধারণ করে আমাদের একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা যে ধর্মেরই অনুসারী হই না কেন, সকল ধর্মের মূল শিক্ষা হচ্ছে শান্তি, শৃঙ্খলা, মানবতা ও সম্প্রীতি। বাংলাদেশে কোনো নাগরিক যেন তার ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার না হন— এটি আমাদের সবার প্রত্যাশা। অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশ্বজিৎকে হত্যা করা হয়েছিল। আমরা চাই না, ভবিষ্যতে আর কোনো বিশ্বজিৎ এ ধরনের নৃশংস হামলার শিকার হোক। এ ধরনের সহিংসতা ও বৈষম্যের সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন অসাম্প্রদায়িক নেতা, যিনি দেশের সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে সমানভাবে ধারণ করেন। তার নেতৃত্বে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় রয়েছে, যেখানে ধর্ম যার যার— কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার সবার। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে যেন বৈষম্যের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
সভাপতির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আচার-অনুষ্ঠান ভিন্ন হলেও শান্তি, মানবতা, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য অভিন্ন। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শন থেকে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পাওয়া যায়। তার এই মহান শিক্ষাকে আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, যেখানে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্মীয় অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবেন এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পালন করতে পারবেন।
স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। তিনি জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য তুলে ধরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল, সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন, জবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি একেএম রাকিবসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
জেআই
