বিজ্ঞাপন

জাবিতে মাঠ সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার আগেই টাকা উত্তোলন

জাবিতে মাঠ সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার আগেই টাকা উত্তোলন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কার কাজের দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নিয়মের বাইরে গিয়ে অর্থ উত্তোলনসহ সবকিছু নিয়েই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার এ প্রকল্পে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) ব্যবহার করে এবং দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানের তথ্য গোপন করে হল প্রশাসনের পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কাজ শুরুর আগেই বিল জমা দিয়ে প্রকল্পের পুরো অর্থ তুলে নেওয়া এবং সেই অর্থ ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগও সামনে এসেছে।

জাবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ১৪৪৫ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের রিটেনশন মানির মুনাফা থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কারের জন্য ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া দরপত্র দেওয়া বা দরপত্র আহ্বান টিম গঠনের কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই কার্যালয়ের সম্পৃক্ততা নেই। 

অথচ, সরকারি ক্রয় বিধিমালা-পিপিআর অনুযায়ী কোনো দরপত্র আহ্বান করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ জনের মূল্যায়ন টিম গঠন করতে হয়। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল মাঠ সংস্কারের টেন্ডার আহ্বানের ক্ষেত্রে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, হলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ ও ডেপুটি কম্পট্রোলার আবু মোহাম্মদ কাওছারের নেতৃত্বে মাত্র ৩ সদস্যের একটি টিম রয়েছে বলে জানা যায়। যাদের কারোরই প্রকৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই। এ ছাড়া মাঠ সংস্কার কাজ তদারকির জন্য পৃথক কোনো তদারকি কমিটি গঠন করা হয়নি।

পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ

উন্মুক্ত টেন্ডারের সুযোগ সীমিত রেখে এলটিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের। এ পদ্ধতিতে টেন্ডারের নোটিশ দেওয়ার বিষয়টিও গোপন রাখা হয় বলে তারা জানান। সরেজমিনে হলটির নোটিশ বোর্ডেও এ নিয়ে কোনো বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়নি। এতে টেন্ডার আহ্বানের প্রকৃত প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে গঠিত সংগঠনের সভাপতি শহিদ বলেন, সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো কাজের টেন্ডার হলে আমরা ক্যাম্পাসের লাইসেন্স করা সকল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানি। অনেকদিন ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল মাঠের কাজ নিয়ে টেন্ডার হবে বলে শুনে আসছি, এমনকি নোটিশ বোর্ডও চেক করতে গেছি। কিন্তু টেন্ডার যে কখন দেওয়া হলো তা আমিও জানি না, অন্যরাও জানে না।

দরপত্র আহ্বানে অনিয়ম

শুরুতে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে হল প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প কার্যালয় জানে বলে জানান।

এ বিষয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প অফিস এলটিএম বা সীমিত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করেছে। হারুন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। হল প্রশাসন শুধু কাজটি তদারকি করে বুঝে নেবে।

তবে প্রাধ্যক্ষের এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প দপ্তরের উপ-পরিচালক ফাহমিদা মাছউদ বলেন, মাঠের টেন্ডার করা বা ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া প্রকল্প দপ্তর করেনি। এটি সম্পূর্ণ হল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। টেন্ডার ছাড়া এত টাকার কাজ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পরবর্তীতে কে বা কোন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তা আমাদের জানানো হয়নি।

প্রাধ্যক্ষ এবং প্রকল্প দপ্তরের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই টেন্ডার আহ্বান প্রক্রিয়ার ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তবে হল প্রশাসন বলছে, তারা যথাসময়ে টেন্ডার আহ্বান করেছিল এবং সেটির নোটিশও দেওয়া হয়েছিল, যেখানে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে বলে জানান তারা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর কথা বললেও বাস্তবে মাঠে কাজ করছে আবুল হোসেন নামের এক ঠিকাদার, যার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’। সরকারি কাজ করার মতো কোনো বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স তার নেই বলে সে নিজেই স্বীকার করেছে।

মাটি ক্রয় না করে লেকপাড়ের মাটি দিয়ে ভরাট করার অভিযোগ

গত ২৫ ও ২৬ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, বাইরে থেকে মাটি ক্রয় না করে হলটির পশ্চিম পাশের জঙ্গলাকীর্ণ লেকপাড়ের (গেরুয়া লেক) মাটি কেটে মাঠ ভরাটের কাজ করছে ঠিকাদার আবুল হোসেন। এতে সংস্কার করতে গিয়ে মাঠের পূর্ব পাশে রবীন্দ্র চত্বর ঘেঁষে থাকা দুটি কৃষ্ণচূড়া গাছও কেটে ফেলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঠিকাদার আবুল হোসেন বলেন, আমি অরুণাপল্লীতে কাজ করতাম। আমি সরাসরি স্যারের (প্রাধ্যক্ষ) কাছ থেকে কাজটা নিছি। স্যার কত টাকা দিবে না দিবে, এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কোনো টেন্ডারও আমি নিইনি। হল থেকে যেভাবে দেখায়, আমি সেভাবে কাজ করছি।

মাঠের কাজটি করতে আনুমানিক কত টাকা লাগতে পারে জানতে চাইলে ঠিকাদার আবুল হোসেন বলেন, প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা হলে কাজটা হয়ে যাবে। কাজটি শেষ করতে তাকে কত টাকা দেওয়া হবে জানতে চাইলে তার সঙ্গে মোট টাকার কোনো চুক্তি হয়নি বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

নিয়ম না মেনে কাজ শুরুর আগেই টাকা উত্তোলন

মাঠের সংস্কার কাজ বাস্তবে শুরু হওয়ার ১ সপ্তাহ আগেই প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে হারুন এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে। টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে হারুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, যে টাকার কথা বলছেন, সেটা আমি আবার জমা দিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত চলছে, এ বিষয়ে রোববার সরাসরি আমি আপনাকে বলবো। তবে কার কাছে অর্থ জমা দিয়েছের এবং কবে কখন তুলেছিলেন- সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন। এরপর একাধিকবার কল দেওয়া হলেও সে আর কল রিসিভ করেনি।

টাকা উত্তোলনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার কার্যালয় থেকেও নিশ্চিত হওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার কার্যালয়ে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা বলেন, মাঠের কাজ শুরু কিংবা শেষ হয়েছিল কি না, তা আমরা জানতাম না। তবে কাজ শেষ করার বিল জমা দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে প্রকল্পের পুরো অর্থ ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার চেক গত ১৯ আগস্ট নিয়ে গেছেন।

কাজ শেষ না করে টাকা উত্তোলন করা যায় কি না- এ বিষয়ে জানতে গত ৩ দিন ধরে হারুন এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মো. হারুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দেখা করে বলবেন বলে বিভিন্ন ধাপে সময় নিলেও দেখা করেননি। সর্বশেষ তিনি মুঠোফোনে বলেন, অনিয়ম ও টাকার বিষয়টি তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে আমি এখন আর কথা বলবো না, রোববার কথা বলবো।

এদিকে কাজ শুরুর আগেই টাকা উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম ঢাকতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারুন এন্টারপ্রাইজ হল সংসদের সহযোগিতায় তড়িঘড়ি করে মাঠ সংস্কারের কাজ শেষ করার জন্য প্রশাসনকে চাপ দিতে থাকে। এমনকি প্রশাসনের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে বৃষ্টির মধ্যেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

স্বল্প সময়ে তদন্ত রিপোর্টে সন্দেহ

এর আগে গত ২৬ আগস্ট একাধিক গণমাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ হল সংলগ্ন মাঠ সংস্কার কাজের দরপত্রের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

রোববার তদন্ত রিপোর্ট আসবে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও তদন্ত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মাহবুব কবির বলেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হলেও সাক্ষীসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রয়োজনে তাতে ৭ দিন সময় নেওয়া হয়েছিল। যেসব অনিয়মের কথা জানানো হয়েছে, তার সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।

কাজ শুরুর আগেই টাকা তোলা প্রসঙ্গে তিনি জানান, অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঠিকাদারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। বিষয়টি তাদের জ্ঞাত আছে, রিপোর্ট এলে তখন বিস্তারিত জানা যাবে।

বাইরে থেকে মাটি এনে কাজ করার পরিবর্তে লেকের পাড়ের পচা মাটি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি জানান, বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণকাজের সময় যে মাটি কেটে ফেলে রাখা হয়, সেখান থেকে কিছু মাটি আনা হয়েছে এবং তার ওপর মাটি দিয়ে রোলার করা হবে। প্রকল্পের নির্ধারিত পরিকল্পনায় (শিডিউলে) বিষয়টি উল্লেখ ছিল কি না জানতে চাইলে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত কমিটি যেকোনো ধরনের চাপের ঊর্ধ্বে থেকে রিপোর্ট জমা দেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি সরেজমিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের মাঠ সংস্কার কাজের তদন্তে এলে, এর পরপরই হলের শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ মেসেঞ্জার গ্রুপে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাহমুদুল হাসান ইমন (বাবু) লেখেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট পজিটিভ, রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জমা দেওয়া হবে। ভিসি পারমিশন দিলেই কাজ শুরু হবে। কত দ্রুত ভিসির পারমিশন পাবো, সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের শিক্ষার্থীদের বল প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে।’ বিষয়টি নিয়ে জানতে তাকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি।

অভিযোগের তদন্ত সাপেক্ষে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম জানান, টেন্ডার ছাড়া প্রশাসনিক কাজ হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, জবাবদিহিতা থাকে না। এই হল মাঠ সংস্কার কাজ পেছানো নিয়ে একটি প্রশাসনিক চক্র আগে থেকেই কাজ করছে। তদন্ত সাপেক্ষে এই প্রহসনের সত্যতা সামনে আসুক, সেটাই প্রত্যাশা।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে মুঠোফোনে ও এসএমএসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আরএআর