পুরান ঢাকার কলতাবাজারে একটি ছাত্রী মেস থেকে র্যাব পরিচয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক ছাত্রীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে হস্তক্ষেপ করলে ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়েই তারা চলে যান। এদিকে ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে র্যাবের এক কর্মকর্তার বাসা থেকে চুরি হওয়া স্বর্ণালংকার ক্রয় করার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে সংবাদ সম্মেলনে নিজের ছোট বোনের সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে কলতাবাজারের জনসন রোডের লবণের গুদাম গলির একটি ছাত্রী মেসে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট র্যাব-২ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হাসান মুহাম্মাদ মুহতারিমের (৩৯) বাসার আলমারি থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনায় তাদের সাবেক গাড়ি চালক ও চালকের স্ত্রীর নামে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরির মামলা
র্যাব-২-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হাসান মুহাম্মাদ মুহতারিমের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, তার সাবেক গাড়িচালক মো. রাসেল ও রাসেলের স্ত্রী মোছা. মাছুরা বেগমের বিরুদ্ধে বাসা থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরির অভিযোগ রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, গত ২২ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রাসেল ও তার স্ত্রী বাদীর বাসায় গিয়ে পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ও কথিত জিনের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের কথা বলেন। বাদীর স্ত্রীর সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তারা বাসার আলমারির ড্রয়ারে রাখা নগদ ১৪ লাখ টাকা এবং প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, যার আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ টাকা, কৌশলে চুরি করে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, রাসেল আগে বাদীর ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পূর্বপরিচিত ও বিশ্বস্ত হওয়ায় বাদীর স্ত্রী রাসেল ও তার স্ত্রীর কথায় বিশ্বাস করেন। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে বাদী তা জানতে পারেন এবং যাচাই করে দেখেন, তার স্ত্রীকে কথিত জিন ও অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলে টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে মোট ৩৯ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় রাসেল ও মাছুরা বেগমকে আসামি করে মামলা করা হয়।
বর্ষার বিরুদ্ধে চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগ
এজাহারে মামলার বাদী বলেন, ‘বিশ্বস্ত সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারি পুরান ঢাকার কলতাবাজারের মমতাজ ওরফে বর্ষার নিকট চোরাইকৃত স্বর্ণালংকার নগদে বিক্রয় করা হয়েছে।’
মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাসেল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে চুরি করার অভিযোগ, আর মমতাজ আরা বর্ষার বিরুদ্ধে চুরি হওয়া স্বর্ণালংকার ক্রয় করার অভিযোগ করা হয়। মমতাজ আরা বর্ষাকে ওই চুরির মামলার আসামি করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে বর্ষার দাবি
এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী দাবি করেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া প্রতিশোধ নিতে র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণের চেষ্টার করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ আরা বর্ষা বলেন, ‘এ বছরের মে মাসে আমার ছোট বোনের সঙ্গে তার স্বামীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।’ এরপর থেকেই সুমন তাদের পরিবার ও তার বোনকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা গত মাসে দিনাজপুর জজকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এরপর সে ফোনে ও মেসেজের মাধ্যমে আমাদের হুমকি দেয়। সুমন মিয়া র্যাবের আইটি সেকশনে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। সে র্যাবের সেই পরিচয় ব্যবহার করে আমাকে অপহরণের চেষ্টা করেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা করায় সে প্রতিশোধ নিয়েছে।’
বেআইনিভাবে তুলে নেয়ার চেষ্টার অভিযোগ
র্যাবের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী বর্ষা। কোনো প্রকার পরিচয়পত্র ও ওয়ারেন্ট ছাড়াই তার বাসায় তল্লাশি ও গাড়িতে করে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত র্যাব পরিচয় দেওয়া সদস্যদের সূত্রাপুর থানা পুলিশের রিকুইজিশন চাইলে তারা আমাকে দিতে পারেনি। তখন আমার মনে হয় এখানে আইন বহির্ভূত কিছু হচ্ছে। তাছাড়া তল্লাশি করে র্যাব সদস্যরা কোনো রিকভারিও দেখাতে পারেনি। তখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বাধা দেই।
সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বর্ষা বলেন, ‘খুব ভোরে সিভিল ড্রেসে কয়েকজন এসে আমাদের ফ্ল্যাটে দরজা নক করে। অপরিচিত তাই আমরা দরজা খুলিনি। তারা র্যাবের পরিচয় দেয়, কিন্তু কোনো আইডি কার্ড, মামলা কিংবা ওয়ারেন্ট দেখাতে পারেনি। আমরা বারবার ওয়ারেন্ট দেখাতে বললেও তারা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আমাকে তুলে নিতে চায়। আমার বাসাও সার্চ করে।’
বর্ষা অভিযোগ করে বলেন, ‘বাসার কেচিগেটে তালা লাগিয়ে তারা র্যাব পরিচয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা বাসা সার্চ করে। আমরা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ট্রিপল নাইনে (পুলিশের জরুরি সার্ভিস নাম্বার) কল দিলে পুলিশ গেট তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে ঢুকতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাররা ভেতরে আসতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো নারী র্যাব সদস্য ছিল না। পুরুষ সদস্যরা কীভাবে নারীদের মেসে সার্চ করে? ওয়ারেন্ট ছাড়া কীভাবে আমাকে তুলে নিতে চায়? এ ঘটনায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমি আমার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্তক্ষেপে নেওয়া হয়নি বর্ষাকে
ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর, পরিবহন প্রশাসক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (জকসু) সমাজসেবা সম্পাদক ও উপস্থিত শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপে বর্ষাকে রেখে স্থান ত্যাগ করেন র্যাব সদস্যরা।
জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফোন পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে যাই এবং সূত্রাপুর থানার ওসিকে বিষয়টি জানাই। পরে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঘটনাস্থলে আসেন। র্যাবের পরিচয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথমে সন্দেহ তৈরি হলে পরে সেখানে র্যাবের সদস্যরা আসেন। শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।’
পুলিশের বক্তব্য
সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে যারা এসেছিল, তারা র্যাবের সদস্য ছিল এবং একটি মামলার অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিল। পরে ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়ে তারা চলে যায়।’
মামলা ও র্যাবের অভিযানের বিষয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা একটি চুরির মামলার প্রেক্ষিতে চোরাই স্বর্ণালংকার ক্রয়ের অভিযোগে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। এক এএসপির বাসা থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকার স্বর্ণ ও নগদ টাকা চুরি হয়েছিল। মামলায় দুজন আসামি ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছে, তবে তাদের কাছ থেকে কোনো মালামাল উদ্ধার করা যায়নি। পুলিশ র্যাবকে এ বিষয়ে একটি রিকুইজিশন দিয়ে রেখেছিল।
তিনি বলেন, ‘এজাহারে অভিযুক্তের নাম উল্লেখ ছিল যে তিনি চোরাই স্বর্ণালংকার ক্রয় করেছেন বলে। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আলামত পাওয়া যেতে পারে— এমন সূত্র ধরে হয়তো র্যাব সেখানে গিয়েছিল।’
ভুক্তভোগীর ছোট বোনের সাবেক স্বামীর র্যাবের আইটি সেকশনে কাজ করা বা পারিবারিক শত্রুতার অভিযোগের বিষয়টি প্রথম শুনেছেন বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
আরএফ
