নতুন প্রক্টরেরও অপসারণ চান শাবি শিক্ষার্থীরা

Dhaka Post Desk

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, শাবি

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:০৯ পিএম


নতুন প্রক্টরেরও অপসারণ চান শাবি শিক্ষার্থীরা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইশরাত ইবনে ইসমাইলের  অপসারণ চেয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে আলোচনা ও মন্ত্রীর ক্যাম্পাস সফর শেষে শিক্ষার্থীদের পক্ষে শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানান শিক্ষার্থী ইয়াসির সরকার।

এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে আলমগীর কবিরকে সরিয়ে বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত ইবনে ইসমাইলকে প্রক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

ইয়াসির সরকার বলেন, নবনিযুক্ত প্রক্টরের সামনে এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করা হয়েছিল। তবে তিনি সে সময় ঘটনাটি প্রতিহত করার কোনো উদ্যোগ নেননি। ওই ঘটনাটি এখন তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাকে দেওয়া ঠিক হয়নি। তাকে অপসারণের জন্য আমরা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছি। মন্ত্রী আমাদের এ ব্যাপারে যথাযত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া আগামীতে প্রক্টর নিয়োগে শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী।

ইয়াসির বলেন, আমরা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আটটি দাবি জানিয়েছি। এর মধ্যে আমাদের প্রধান দাবি উপাচার্যের পদত্যাগ ছাড়া বাকি সবগুলো ইতিবাচকভাবেই নিয়েছেন মন্ত্রী। এগুলো দ্রুত পূরণের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। উপাচার্যের অপসারণ যেহেতু তার এখতিয়ারভুক্ত নয়, তাই বিষয়টি তিনি আচার্যকে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন,  আমরা আশা করি মহামান্য আচার্য শিক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে আমাদের অভিযোগগুলো জেনে উপাচার্যকে দ্রুত অপসারণে উদ্যোগ নেবেন। মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আমাদের করণীয় নির্ধারণে আগামীকাল শনিবার বিকেলে সব শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা বৈঠক করব। এই বৈঠকের পর আমাদের পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাব। এর আগ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত থাকবে।

এর আগে সিলেট সার্কিট হাউসে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ক্যাম্পাসে পৌঁছে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি পূরণ করে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কথা জানান তিনি। 

সিলেট সার্কিট হাউসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আচার্য যেহেতু একজন উপাচার্যকে নিয়োগ দেন কিংবা অপসারণ করেন, সেহেতু আমরা বিষয়টি আচার্যকে অবহিত করব। 

তিনি আরও বলেন, আমরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা তাদের বক্তব্য, দাবি-দাওয়া ও পুরো ঘটনা তুলে ধরেছেন। ভালো আলোচনা হয়েছে, ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের কথা বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদের যে দাবিগুলো আছে শিক্ষার মান, আবাসনের মান কীভাবে উন্নত করা যায় সে সংক্রান্ত তারা নিজেরাই চিন্তা করে বেশ কিছু প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে। আমরাই বলেছিলাম, তাদের ঠিক করতে। আমরা যে প্রস্তাবগুলো দেখলাম, তার মধ্যে বেশ কিছু ইতোমধ্যে পূরণ করা হয়ে গেছে। আরও যেগুলো আছে প্রায় সবগুলোই আমরা আশা করি পূরণ করতে পারব। সে উদ্যোগ আমরা নেব।

এ সময় শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব  আফসার উদ্দিন কামালী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব ফেরদৌস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

শিক্ষার্থীদের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন মোহাইমিনুল বাশার রাজ, ইয়াসির সরকার, নাফিসা আনজুম, সাব্বির আহমেদ, আশিক হোসাইন মারুফ, সাবরিনা শাহরিন রশীদ, সুদীপ্ত ভাস্কর, শাহরিয়ার আবেদীন, আমেনা বেগম, মীর রানা ও জাহেদুল ইসলাম অপূর্ব।

প্রসঙ্গত, গত ১৬ জানুয়ারি বিকেলে তিন দফা দাবি আদায়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ভবনে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে পুলিশ উপাচার্যকে উদ্ধার করতে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। 

এ ঘটনায় দুইশ থেকে তিনশ অজ্ঞাত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে- আন্দোলনরত দুইশ-তিনশ উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থী হঠাৎ কর্তব্যরত পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তারা সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র ধরে টানাটাানি করে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়ে। এ ছাড়া পুলিশের ওপর ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। 

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় ১৪ জানুয়ারি দিবাগত রাতে। তখন শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছাত্রী হলে নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান চেয়ে তারা হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদকে কল করেন। প্রভোস্টকে ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘বের হয়ে গেলে যাও, কোথায় যাবে? আমার ঠেকা পড়েনি।’ শিক্ষার্থীরা বিষয়টি জরুরি উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘কীসের জরুরি? কেউ তো আর মারা যায়নি।’ 

পরে প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন ছাত্রীরা। এরই মধ্যে ১৬ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইআইসিটি) ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। তবে ওই নির্দেশনা অমান্য করে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে পরিণত হয়।

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ১৯ জানুয়ারি বিকেল ৩টা থেকে তার বাসভবনের সামনে আমরণ অনশনে বসেন ২৪ জন শিক্ষার্থী। এক পর্যায়ে আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের অনুরোধে ২৬ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা অনশন ভাঙেন। তবে অনশন ভাঙলেও উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। 

আরএআর

টাইমলাইন

Link copied