দুর্ভাগ্যবশত আমরা হামলার শিকার হয়েছি

নিরাপদে বাড়িতে ফিরেছেন সাতক্ষীরার এডিশনাল ক্যাপ্টেন মুনসুরুল আমিন খান (৩৬)। স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে। গতকাল বুধবার (৯ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সাতক্ষীরার বাড়িতে পৌঁছান ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের এই নাবিক। নিরাপদে বাড়িতে ফিরেও সহকর্মীকে হারিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছেন তিনি।
ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে ২৯ নাবিকের সঙ্গে আটকা পড়েছিলেন এডিশনাল ক্যাপ্টেন মুনসুরুল আমিন খান। বুধবার নিরাপদে দেশে ফিরেছেন জাহাজে জীবিত থাকা ২৮ নাবিক।
ইউক্রেনে বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে রাশিয়ান বাহিনীর মিসাইল হামলায় নিহত হন বরগুনার নাবিক হাদিসুর রহমান।
এডিশনাল ক্যাপ্টেন মুনসুরুল আমিন খান সাতক্ষীরা শহরের নারকেলতলা এলাকার অবসরপ্রাপ্ত বিএডিসি কর্মকর্তা সেলিম খানের একমাত্র ছেলে।
বাড়িতে ফিরে জাহাজে হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মুনসুরুল আমিন খান বলেন, জাহাজটি বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ। আমরা ধারণা করেছিলাম আমাদের জাহাজের ওপর কোনো হামলা হবে না। তবে দুর্ভাগ্যবশত আমরা হামলার শিকার হয়েছি। ২ মার্চ স্থানীয় সময় ৫টা ১০ মিনিটের দিকে একটি মিসাইল হামলা হয় জাহাজটিতে। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে আগুন ধরে যায়। আমরা সবাই আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তার আগে সবাই ঠিক আছে কিনা দেখা হয়। তখন দেখা যায় জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মিসিং রয়েছে।
তিনি বলেন, আগুন নেভানোর পর আমরা থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুরের মরদেহ খুঁজে পাই। যেখানে মিসাইল হামলা হয়েছিল তার পাশেই পড়েছিল তার মরদেহ। কে হামলা করেছে সেটি আমাদের জন্য বোঝা কঠিন ছিল। আমরা অবগত ছিলাম না কে ঘটনাটা ঘটালো। আমরা পরিস্থিতির শিকার হয়ে গিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটি আমরা কোম্পানিকে জানাই। বাংলাদেশ সরকার ও শিপিং কর্পোরেশনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় হামলার পরদিন সকালে একটা সেভ বাংকারে ঢুকতে পেরেছিলাম ও নিরাপদে দেশে ফিরতে পেরেছি। পরিবারে ফিরে এখন স্বস্তি লাগলেও দুঃখ থেকেই যাচ্ছে আমরা এক সহকর্মীকে হারিয়ে ফেলেছি। তাকে জীবিত ফিরিয়ে আনতে পারিনি।
মুনসুরুল আমিন খানের বাবা সেলিম খান বলেন, বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে এডিশনাল ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগদান করে ছেলে। শ্রীলঙ্কা থেকে তুরস্ক হয়ে যখন ইউক্রেনে যায় তখনই রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। খবরটি পাওয়ার পরই মনে হয়েছিল, ছেলে আদৌ ফিরে আসতে পারবে কিনা। উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলাম বাড়ির সবাই। আমার একটা মাত্র ছেলে। তার ছোট ছোট তিনটি সন্তান। সরকারের চেষ্টায় যুদ্ধের ভেতর জাহাজ থেকে তাদের নামিয়ে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শিপিং কর্পোরেশন, প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনে হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনে আটকে পড়ে বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজ। ২ মার্চ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২৫ মিনিটে জাহাজটি হামলার শিকার হয়। হামলায় জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. হাদিসুর রহমান নিহত হন। জাহাজটিতে মোট ২৯ জন বাংলাদেশি নাবিক ছিলেন।
জীবিত ২৮ নাবিককে গত ৩ মার্চ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে ইউক্রেনের একটি বাংকারে নেওয়া হয়। পরে তাদের নিরাপদে রোমানিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সিরামিকের কাঁচামাল ‘ক্লে’ পরিবহনের জন্য জাহাজটি তুরস্ক থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরের জলসীমায় পৌঁছায়। সেখান থেকে কার্গো নিয়ে ইতালি যাওয়ার কথা ছিল এটির। তবে যুদ্ধাবস্থা এড়াতে জাহাজটিকে সেখানে পৌঁছানোর পরপরই পণ্যবোঝাই না করে দ্রুত ফেরত আসার জন্য নির্দেশনা দেয় শিপিং কর্রোরেশন। শেষ মুহূর্তে পাইলট না পাওয়ায় ইউক্রেনের জলসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বাংলাদেশের এই জাহাজ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অলভিয়া বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
আকরামুল ইসলাম/আরএআর