রাজশাহীতে সাড়া ফেলেছে সেলিব্রেটি গ্যালারি

Dhaka Post Desk

ফেরদৌস সিদ্দিকী, রাজশাহী

১৭ মে ২০২২, ০১:২৯ পিএম


বিশ্ববিখ্যাত কবি, রাষ্ট্রনায়ক থেকে নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা ও ফুটবলার এখন রাজশাহীতে এক ছাদের নিচে। অবয়বগুলো নিছকই ফাইবার গ্লাসে তৈরি। তবু রক্তে-মাংসের গড়া মানুষ ভেবে ভুল হবে যে কারও। রাজশাহীর কৃতী সন্তান খ্যাতিমান ভাস্কর মৃণাল হকের এসব শিল্পকর্মে যেন রাজশাহীতে বসেছে চাঁদের হাট।

জানা যায়, ৩২ জন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য নিয়ে রাজধানীর গুলশানে ‘সেলিব্রেটি গ্যালারি’ চালু করেছিলেন ভাস্কর মৃণাল হক। কিন্তু তার মৃত্যুর পর এটি নানা সংকটে পড়ে। পরে এই উদ্যোগ সরিয়ে নেওয়া হয় রাজশাহীতে।

নগরীর উপশহর এলাকার ৩ নম্বর সেক্টরের একটি দ্বিতল ভবনে ‘সেলিব্রেটি গ্যালারি’ উদ্বোধনের অপেক্ষায়। তবে উদ্বোধনের আগেই নগরবাসীর মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে সেলিব্রেটি গ্যালারি। ৬ মে থেকে দর্শনার্থীরা দেখতে আসছে এসব ভাস্কর্য। দিন দিন উপস্থিতিও বাড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দ্বিতল ভবনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই চোখে আটকে গেল স্পাইডার ম্যানে। যেন সিঁড়ির ওপরেই ঝুলে রয়েছে শিশুদের প্রিয় এই মারভেল সিরিজের চরিত্রটি।

দোতলার প্রথম কক্ষটিতে সাজানো এক সারি আবক্ষ মূর্তি। এখানে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় চার নেতা এএইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মীর মশাররফ হোসেন, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ।

সামনে এগোতেই আরেক কামরা। যেখানে চলছে আলো-আঁধারির খেলা। সবার মনে আছে কি বলিউডের ‘কই মিল গ্যায়া’ সিনেমার সেই জাদুর কথা? এখানে দেখা হয়ে যাবে ভিন গ্রহের এই বাসিন্দার সঙ্গে।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরনের অনবদ্য সৃষ্টি ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার নাবি সম্প্রদায়ের জ্যাক ও নিতিরি চরিত্রের দেখাও মিলবে এই কামরায়। এখানে রয়েছে জীবন্ত ‘লর্ড অব দ্য রিং’-এর গুল্লাম।

বাঁ পাশের দরজা পেরোতেই পড়বে সুবিশাল কক্ষ। ঢুকতেই ডান হাতে বিখ্যাত কমেডি সিরিজ ‘থ্রি স্টুজেস’-এর তিন মূল চরিত্র। বাঁ হাতে ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, যার পায়ের জাদুতে আটকে রয়েছে ফুটবল।

কক্ষজুড়ে নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলিউড তারকা শাহরুখ খান, মি. বিন খ্যাত রোয়ান অ্যাটকিনসন, খ্যাতিমান অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন, পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ানের ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো, ভুবন কাঁপানো কণ্ঠস্বর বব মার্লে, পপ গানের রাজা মাইকেল জ্যাকসন, গায়িকা শাকিরা।

পরের কামরাটি আলো-ঝলমলে। ঢুকতেই রাইফেল কাঁধে দাঁড়ানো বিপ্লবের বিশ্বপ্রতীক চে গুয়েভারা। এই কক্ষের এক কোণে বসে কাব্যচর্চায় মগ্ন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাশে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ভারতীয়-বাঙালি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু।

মহাত্মা গান্ধীর পাশে সাদা শাড়িতে মানবতার দূত মাদার তেরেসাও আছেন এই কামরায়। আরও আছেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্সেস ডায়ানা।

শেষের কামরাটি বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বেরিয়ে যাওয়ার পথে দেখা হয়ে যাবে রাগ সংগীতের গুরু উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে। যেন প্রিয় সেতার হাতে সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

এসব ঘুরে ঘুরে দেখতে দর্শনার্থীদের কাছে মনে হবে যেন বাস্তবের অনেক মহীয়সী ও মহীয়ান মানব সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, কথা বলছেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন।

সোমবার সন্ধ্যায় সেলিব্রেটি গ্যালারিতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন ব্যবসায়ী আবু হুরায়রা। এসব আয়োজন দেখে মুগ্ধ তিনি। জানান, সব মিলিয়ে তার এই আয়োজন ভালো লেগেছে। মাঝেমধ্যে পরিবার নিয়ে এখানে আসা হয়।

ঘুরে ঘুরে সেলিব্রেটি গ্যালারি দেখেছেন গৃহবধূ আইনুন নাহার। পছন্দের চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত তিনি। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে তিনি এখানে ঘুরতে এসেছেন। দেখে খুব ভালো অনুভব করছেন তিনি। এখানকার ভাস্কর্যগুলো তার কাছে একেবারেই জীবন্ত মনে হয়েছে। রাজশাহীর মতো একটি জায়গায় এমন একটি আয়োজন সত্যিই তার ভালো লেগেছে।

সেলিব্রেটি গ্যালারির অফিস ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কামরুল হাসান মিলন। গ্যালারির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না হওয়ায় এ নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি নন তিনি। তবে এটুকু নিশ্চিত করেছেন, রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের এটি উদ্বোধন করার কথা। তারা সব প্রস্তুতি মোটামুটি শেষ করে ফেলেছেন।

গত বছরের ৬ জুন থেকে সেলিব্রেটি গ্যালারি উন্মুক্ত। গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন দর্শনার্থী আসছেন। জনপ্রতি তারা প্রদর্শনী ফি নির্ধারণ করেছেন ১০০ টাকা। তবে শিক্ষার্থীরা ৫০ টাকায় ঘুরে দেখতে পারবেন সেলিব্রেটি গ্যালারি। আর সাত বছরের নিচে বাচ্চাদের ঢুকতে কোনো ফি লাগবে না।

কামরুল হাসান মিলন আরও বলেন, তারা ভবনের নিচ তলায় সুবিশাল লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন। সেলিব্রেটি গ্যালারিতে প্রবেশে দর্শনী লাগলেও লাইব্রেরি রাখা হয়েছে একেবারেই উন্মুক্ত।

এর আগে অনেক ভাস্কর্যের মান নিয়ে বিতর্ক উঠলেও এখানে এখনো তা নিয়ে কেউ কিছু বলেননি। তবে কিছু ভাস্কর্যের প্রকৃত আদল নিয়ে অনেকের মনে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

উল্লেখ্য, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের সামনে ‘দুর্জয়’, রূপসী বাংলা হোটেলের সামনের ‘রাজসিক বিহার’, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের ‘রত্নদ্বীপ’, নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সামনের ‘অতলান্তিক’, মতিঝিলের দিলকুশায় ‘বক’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ‘গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার’, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক মোড়ে ‘ইস্পাতের কান্না’, পরিবাগে ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’ কৃতিত্ব মৃণাল হককে চিরভাস্মর করে রেখেছে।

এনএ

Link copied