৩০ বছর পর লিজ মুক্ত শালমারা নদী, উচ্ছ্বসিত জেলেরা

Dhaka Post Desk

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর 

২৮ জুন ২০২২, ১২:০০ পিএম


৩০ বছর পর লিজ মুক্ত শালমারা নদী, উচ্ছ্বসিত জেলেরা

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শালমারা নদী থেকে লিজ বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন। এ খবরে আনন্দে মেতে উঠেছেন নদীপারের ক্ষতিগ্রস্ত জেলেসহ শত শত মানুষ। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর উল্লাসে মাতোয়ারা তারা।

জানা গেছে, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই নদী উদ্ধারে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছিল আন্দোলন-সংগ্রাম। অবশেষে মাটি ভরাটে মৃতপ্রায় সেই শালমারা দখলদারদের কবল থেকে বন্দোবস্তমুক্ত হওয়ায় খুশি সবাই। প্রশাসনসহ নদী রক্ষার আন্দোলন সংগ্রামে জড়িত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি আনন্দের জানান দিতে চলছে নানা আয়োজন। 

সোমবার (২৭ জুন) দুপুরে উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের শালমারা নদীর কোলঘেঁষা হাটে আনন্দ মিছিল করেছেন স্থানীয়রা। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের অর্জনে বিজয় উল্লাস উদযাপন করেছেন তারা।‌ পরে শালমারা হাটে আলোচনা সভার আয়োজন করে রিভারাইন পিপল ও শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটি। 

Dhaka post

এ সময় সভায় বক্তারা জানান, নব্বইয়ের দশকের আগে শালমারা হাটের পাশেই নূর রহমান, নূরুন্নবী ও নুরুজ্জামানসহ প্রভাবশালীরা ক্ষমতার জোরে ওই নদীর বড় একটি অংশ ব্যক্তি নামে লিজ নেন। এরপর সেখানে মাছ চাষসহ কোথাও কোথাও নদী কেটে গড়ে তোলেন বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে মাঝিমল্লাসহ নদীনির্ভর স্থানীয়রা হারিয়ে ফেলেন তাদের অধিকার। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আশির দশকে ৫ জনকে কারাবরণও করতে হয়েছে। মামলা হয়েছিল ৭২ জনের নামে। পরবর্তীতে মামলার রায়ে তারা নিরাপরাধ প্রমাণিত হন।

তাদের অভিযোগ, মাটি ভরাটে এখন মৃতপ্রায় শালমারা নদী। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি এক সময়ের প্রবাহমান নদী। ঐতিহ্যবাহী এ নদীটির শুষ্কতার সুযোগ নিয়ে ফসল চাষের প্রতিযোগিতা করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী কৃষক ও দখলদাররা। 

দীর্ঘ আন্দোলন, জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়নের পর অবৈধ বন্দোবস্ত (লিজ) বাতিল হওয়ায় স্থানীয় উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকসহ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শালমারা রক্ষার আন্দোলনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী স্থানীয়রা। তারা জানান, ২০১৯ সালে রিভারাইন পিপল নামে একটি সংগঠন শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটি গঠন করে। এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় কারাবাস করা শাহ জালালকে। নদীটি রক্ষায় নতুন করে আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। সেই আন্দোলনের অর্জন শালমারাকে অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার করা।

Dhaka post

আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শাহ জালাল, সদস্য সচিব মোহাম্মদ হালিম রাঙা, সদস্য আজিজার রহমান, মাহফুজার রহমান, রূপা দাস, জেলে হেম চন্দ্র দাস প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্য শরিফুল ইসলাম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মে মাসে রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসানের সভাপতিত্বে ‘জেলা কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কমিটির’ মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কার্যবিবরণীতে শালমারা নদীর ছয়জনের গ্রহণ করা জমির লিজ বাতিল করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সোমবার বিষয়টি জানাজানি হলে সকাল থেকে শালমারা হাটে জমায়েত হতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদের মধ্যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি। সবার চোখে-মুখে নদী রক্ষা করতে পারার আনন্দ ছিল উপচেপড়ার মতো। 

এই আনন্দ মিছিলে অংশ নেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ, শালামারা নদী সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শাহ জালাল, সদস্য সচিব আব্দুল হালিম রাঙাসহ অনেকেই। নেতৃত্ব দেন রিভারাইন পিপলের শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটির সদস্যরা।

এ ব্যাপারে আন্দোলনকারী শাহ জালাল বলেন, ‘যুবক বয়সে এ নদীর জন্য আন্দোলন করে জেলে গিয়েছিলাম। বৃদ্ধ বয়সে এসে নদী উদ্ধার করতে পারলাম। জীবনে এটা বড় অর্জন। কতজন বলেছিল, এ নদী উদ্ধার করতে হলে আরও একবার জন্ম নিতে হবে। সেটার প্রয়োজন হয়নি। শালমারা মুক্ত দেখে যাচ্ছি। জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই।’

অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, আমরা তিন বছর থেকে আন্দোলন করছি। রংপুর জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রায় চার দশক আগে ব্যক্তির নামে যে অংশগুলো লিখে দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বন্দোবস্ত বাতিলের খবরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেছে এখানকার নদী সংগ্রামীরা। এই নদীর বেহাত হওয়া স্থানে ১০ টাকার মাছ ধরলে অবৈধ দখলদারদের দিতে হতো পাঁচ টাকার মাছ। ওই অংশে সাধারণের পানি স্পর্শও ছিল নিষেধ। এখন নদী দখল মুক্ত। জনজীবনে এ নদীর গুরুত্ব অপরিসীম।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসপি

Link copied