এক হাত দিয়ে আর পারছি না ইজিবাইক চালাতে

Dhaka Post Desk

জেলা প্রতিনিধি, মাদারীপুর

৩১ জুলাই ২০২২, ০৭:৫৮ পিএম


অডিও শুনুন

নিজের ইচ্ছা থাকলে সবকিছু করা সম্ভব, এমন সাহস-শক্তি দিয়ে প্রমাণ করলেন মাদারীপুরের প্রতিবন্ধী ইজিবাইক চালক আলমগীর বেপারী। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়েও কারও কাছে হাত পাতেননি। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে ইজিবাইক চালিয়েই সংসার চালাচ্ছেন আলমগীর।

বেঁচে থাকার তাগিদে ইজিবাইকই এখন তার আয়ের একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু এখানে আছে তার চাপা ক্ষোভ। হাত নেই দেখে অনেকেই উঠতে চায় না তার রিকশায়। ফলে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ টাকা নিয়ে তাকে ঘরে ফিরতে হয়।

পঞ্চাশোর্ধ্ব আলমগীর বেপারীর বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার পৌরসভার কুলপদ্দী এলাকায়। তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। দুই মেয়ের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। পরে ছেলেরা বিয়ে করে যে যার মতো সংসার করছেন।

ছেলেরা নিজেদের পরিবার নিয়ে বিচ্ছিন্ন থাকায় বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ নেন না। তাই বৃদ্ধ স্ত্রী, এক মেয়ে নিয়ে তিনজনের সংসার চালাতে হয় আলমগীর বেপারীকে।

মো. আলমগীর বেপারী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১৯৮২ সালে মাদারীপুর পুরান বাজার পরান দাসের তেলের কারখানায় কাজ করার সময় মেশিনের মধ্যে হাত ঢুকে হাতের অংশ কাটা পড়ে। চিকিৎসা করেছেন অনেক ধারদেনা করে। কিন্তু অভাবের কারণে বসে থাকার সুযোগ ছিল না। তাই কাটা হাতেই ধরতে হয় সংসারের চাকা।

হাতবিহীন ইজিবাইক চালানো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, তা জেনেও চালাচ্ছেন কেন, এমন প্রশ্নে বলেন, এক হাত দিয়ে ইজিবাইক চালানো দেখে মাঝেমধ্যে লোকজন আমার ইজিবাইকে উঠে না। তখন কণ্ঠ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মানুষের প্রচার-প্রচারণার কাজ করে থাকি। এখন আর নিজের জীবনের কোনো পরোয়া করি না। বাঁচতে হলে কিছু করতে হবে। সংসারের ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত আমি। কিন্তু কিছুই করার নাই। সংসারে তিন-চারটি মুখের খাবার আমাকেই প্রতিদিন জোগাড় করতে হয়।

একটু পরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেন, এক হাত দিয়ে আর পারছি না ইজিবাইক চালাতে। কী আর বলব। বলতে অনেক কষ্ট হয়। কান্না আসে কিন্তু এ কান্না দেখার কেউ নেই। সরকার ও বিত্তশীল লোকের কাছে দাবি জানাই, তারা যেন আমাকে একটি দোকান বা স্থায়ী কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। তাহলে আমি এই বৃদ্ধ বয়সে আমার পরিবার-পরিজনকে নিয়ে দুমুঠো খেয়ে বাঁচতে পারব।

তিনি জানান, সব মিলিয়ে দিনে তার মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে আবার ইজিবাইকের ভাড়া দিতে ৪৫০ টাকা। ফলে দৈনিক কখনো ২০০ কখনো ২৫০ টাকা থাকে। এ সামান্য উপার্জন দিয়ে কোনো রকম সংসার চলে। কোনো কোনো দিন না খেয়েও থাকতে হয় তাদের।

এত কষ্ট হলেও তিনি ভিক্ষা করেন না, কারও কাছে হাত পাতবেন না। আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চান। ‘ভিক্ষা করা মহাপাপ, তাই ভিক্ষা করি না’ বলেও গর্ব করেন আত্মমর্যাদাবান এ মানুষটি।

আলমগীরের স্ত্রী জাহেদা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার স্বামীর হাত চলে যাওয়ার কারণে সে রিকশা, ইজিবাইক, ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে এখন এগুলো করতে পারে না। আমাদের এখন দিন চালাতে, খাবার খাইতে অনেক কষ্ট হয়। সরকার যদি আমাদের একটা ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে একটু বাঁচতে পারব।

তাদের প্রতিবেশী আশরাফ বলেন, সে যেভাবে কাজ করে, এটা আসলে একটা জীবন-মরণের খেলা। এত কষ্ট করে সংসার চালায়। আমরা তাকে মাঝেমধ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করি। কিন্তু আমরাও গরিব মানুষ। কতক্ষণ তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব? সরকার যদি তাকে স্থায়ী কাজের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে সে ঠিকমতো বাঁচতে পারবে।

আরেক ইজিবাইক চালক কাজী জগলুর বলেন, আমরা দুহাত দিয়ে  ইজিবাইক চালায়  তাতে আমাদের কন্ট্রোল করতে অনেক কষ্ট হয়। আর আলমগীর ভাই কিভাবে এক হাত দিয়ে ইজিবাইক চালায় তা দেখে আমাদের অনেক খারাপ লাগে। সরকার ও বিত্তশালী লোকজনের কাছে আমাদের দাবি  তাকে একটি দোকান দিয়ে দেয়। তাহলে সে সন্তান ও পরিবার নিয়ে খেয়ে বাঁচতে পারবে।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী আলমগীর বেপারীর খোঁজ নিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে।

এনএ

Link copied