প্রচারণায় না থেকেও রংপুর সিটি নির্বাচনে ডালিয়ার ‌চমক

Dhaka Post Desk

ফরহাদুজ্জামান ফারুক, রংপুর

২৪ নভেম্বর ২০২২, ০১:১৩ পিএম


প্রচারণায় না থেকেও রংপুর সিটি নির্বাচনে ডালিয়ার ‌চমক

রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনে প্রচারণার মাঠে কিংবা আলোচনায় না থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের চমকে দিয়েছেন অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া। আওয়ামী লীগের অর্ধডজন প্রার্থীর স্বপ্নে গুড়ে বালি ঢেলে দিয়ে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। দলের এই সিদ্ধান্তে মনোনয়ন বঞ্চিতদের মন ভাঙলেও ভোটের মাঠে এবার আরেকটি চমকের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার (২৩ নভেম্বর) দুপুরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়াকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে পরিচিত অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। এর আগে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত হয়ে কাজ করে আসছেন।

এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের অর্ধডজন প্রার্থী মাঠে সরব প্রচারণা চালিয়েছেন। যাদের মধ্যে আলোচনায় ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, রংপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাশেম, রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিলন, মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আতাউর জামান বাবু  ও জাতীয় শ্রমিক লীগের রংপুর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদ। তফসিল ঘোষণার পর নতুন করে উঠে আসে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজুর নাম।

তখনও হোসেনে আরা লুৎফা ডালিয়াকে নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি তিনি নিজেও কখনো মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রচারণা চালাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রংপুর সিটিতে নৌকার মাঝি হিসেবে তার ওপরই ভরসা রেখেছে দল। 

হঠাৎ হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া প্রার্থী মনোনীত হওয়ায় বিভিন্ন মহলে নানা রকম কথার ডালপালা ছড়ালেও স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের অভ্যন্তরীণ মনোবিরোধ আর চাপা ক্ষোভ দমাতে এটিকে কৌশল হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। জাতীয় পার্টির দুর্গে প্রার্থী নির্ধারণে আওয়ামী লীগের নতুন এই চমকের কারণে দলের কোন্দলের অবসানের মধ্য দিয়ে রংপুর সিটিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকেই।  

মনোনয়ন না পাওয়া রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি দলের এই সিদ্ধান্তে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।  

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, আমি বিশ্বাস করি রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেত্রী যাকেই দিয়েছেন তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। আপনারা জানেন আমি নিজেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম। আমি মনোনয়ন পাইনি তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন তার পক্ষেই কাজ করব এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করিয়েই প্রধানমন্ত্রীকে নৌকার মেয়র উপহার দিব।

তিনি আরও বলেন, আমি গত তিন বছরে রংপুর নগরের এমন কোনো পাড়া-মহল্লা বাদ রাখিনি নৌকার প্রচার-প্রচারণায়। এই সরকারের নানামুখী উন্নয়নের কথা তুলে ধরেছি। তাই আমি বিশ্বাস করি রংপুরের মানুষ আমার প্রচার করা সেই উন্নয়নের কথাগুলো বিশ্বাস করেছে এবং রংপুরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তারা নৌকা মার্কায় ভোট দেবে। ২৭ ডিসেম্বর নৌকা মার্কা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই।

এদিকে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আতাউর জামান বাবু বলেন,  আমি নির্বাচন করব, আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন। আমি নির্বাচিত হলে যৌক্তিক দাবিগুলো আদায় করবো ইনশাআল্লাহ। আমি রংপুরের মানুষের স্বার্থে দল থেকে বহিষ্কার হতেও রাজি আছি। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীকে কেউ ভুল বুঝিয়ে এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

আওয়ামী লীগ মনোনীত হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া নির্বাচিত হতে পারবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উনাকে দিয়ে রংপুরের মানুষের কোনো উপকার হয়নি। তিনি যখন সংসদ সদস্য ছিলেন তখন রংপুরের একজন মানুষেরও উপকারে আসেননি। তিনিতো রংপুরের মানুষই না। আমাকে দল যদি মনোনয়ন দিত, তাহলে রংপুরে যে কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি আমি তা করার চেষ্টা করতাম।

আতাউর জামান বলেন, নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, তিনি রাজনীতির নামে নেতাদের সঙ্গে ব্যবসা করেন। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তাকে মানুষ কখনোই গ্রহণ করবে না এটা আমার বিশ্বাস। অন্য কেউ প্রার্থী হলে আমার আপত্তি ছিল না।

মনোনয়নের জন্য আলোচনায় থাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু বলেন, নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন তার জন্য শুভ কামনা ও অভিনন্দন। আশা করি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সবাই মিলে আমরা তার পক্ষে কাজ করব। নৌকা প্রতীকের বিজয় হবে ইনশাআল্লাহ।

এদিকে নৌকা প্রতীক পাওয়া আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে রংপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আশা করছি রংপুরের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দেবে, শেখ হাসিনাকে ভোট দেবে। অতীতের মতো আর কেউ ভুল করবে না।

তিনি আরও বলেন, রংপুর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। সকল সহযোগী সংগঠন ও সাধারণ জনগণ আমার সঙ্গে আছেন। তারাই আমাকে উন্নয়নের স্বার্থে ২৭ ডিসেম্বর নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। আমার বিশ্বাস বিপুল ভোটে জয় লাভ করে প্রধানমন্ত্রীকে এই সিটি উপহার দিতে পারব।

কারমাইকেল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এম এ রউফ খান বলেন, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ একটি সুসংগঠিত দল। এই দলের মাধ্যমেই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বকে উৎসাহী করছেন। এ কারণে রংপুর সিটিতে নতুন চমক হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া হোসনে আরা লুৎফাকে ঘিরে নতুন কিছুর সম্ভাবনাও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখানে কে প্রচারণায় ছিল আর কে ছিল না, তা কোনো বিষয় নয়। প্রার্থীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শেখ হাসিনার মনোনয়ন ও নৌকা প্রতীক। আওয়ামী লীগ যাকে মনোনয়ন দিয়েছে তাকেই দলের সবাই শেষ পর্যন্ত সমর্থন করবে। মাঠে থাকবে, ভোটও দেবে। আর হোসনে আরা লুৎফা সংসদ সদস্য ছিলেন, তিনি সবার পরিচিত মুখ। তার সঙ্গে কারো কোনো বিরোধও নেই।  দলের সবাই যদি অভ্যন্তরীণ মান অভিমান ভুলে একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে লাঙ্গলের ঘাঁটিতে নতুন চমক হবেন হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া।

গত ৭ নভেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত মেয়র পদে ৮ জন মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় পাটির প্রার্থী হিসেবে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র (রওশন-রাঙ্গাপন্থি) একেএম আব্দুর রউফ মানিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল, জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগরের সাবেক আমির অধ্যাপক মাহাবুবার রহমান বেলাল, জাকের পার্টির খোরশেদ আলম, স্বতন্ত্র হিসেবে তরুণ ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বনি ও ইঞ্জিনিয়ার লতিফুর রহমান মিলন মনোনয়নপত্র কিনেছেন। এছাড়া মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব আবদুল বাতেন জানান, বুধবার (২৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২৪১ জন সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৮ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৭২ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬১ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এদের মধ্যে শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
 
উল্লেখ্য, পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডের সঙ্গে বর্ধিত এলাকার (সাবেক সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে) আরও ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত করে ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে ২০১২ সালের ২৮ জুন রংপুর সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়। এরপর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝণ্টু প্রথম নগরপিতা হিসেবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এই সিটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। আর ভোটার রয়েছেন চার লাখেরও বেশি। ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় নির্বাচনের সময় ভোটার ছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন। এতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা মেয়র নির্বাচিত হন।

এবার তৃতীয় বারের মতো রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন ২৯ নভেম্বর। ১ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ৮ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ। প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে পরদিন ৯ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা ১৭ দিন প্রচার-প্রচারণার সুযোগ পাবেন। ২৭ ডিসেম্বর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এক টানা ভোটগ্রহণ করা হবে।

আরএআর

Link copied