বৃদ্ধ ফরিদের সামাজিক-মানসিক ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Dhaka Post Desk

রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

২৪ মে ২০২১, ০২:৫১ এএম


বৃদ্ধ ফরিদের সামাজিক-মানসিক ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

ভুক্তভোগী ফরিদ উদ্দিন

নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ নাগবাড়ী এলাকার ফরিদ উদ্দিনের বাড়ীর গলিতে চলছে গণমাধ্যমকর্মীদের আনাগোনা। গত দুদিন ধরে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল আর নিউজ পোর্টালগুলোতে ফরিদ উদ্দিনের কাহিনী যেন দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তের বাস্তব আর বর্তমান চিত্রকেই বর্ণনা করছে।

সরকারের হটলাইন ৩৩৩ চালু হয়েছিল নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য। যারা ত্রাণ সহায়তা নিতে লাইনে দাঁড়াতে পারেন না, ক্ষুধা পেটে থাকলেও মুখে বলে কারো কাছে চাইতে পারেন না, তাদের সহায়তা করতেই সরকারের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

যারা ক্ষুধা পেটে থাকলেও মুখে বলে কারো কাছে চাইতে পারেন না- তাদেরই একজন ছিলেন ফরিদ উদ্দিন। কিন্তু হটলাইনে খাদ্য সহায়তা চাইতে গিয়ে উল্টো স্থানীয় মেম্বারের অসত্য তথ্য প্রদান আর উপজেলা প্রশাসনের চরম অসতর্কতার কারণে তার পুরো পরিবারকে হেয় হতে হয়েছে, শিকার হতে হয়েছে অমানসিক যন্ত্রণার। 

এ ঘটনা শুধু নারায়ণগঞ্জে নয়, সারা দেশেই আলোড়ন তুলেছে। পাশাপাশি ঝড় তুলেছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিশেষ করে ফরিদ উদ্দিনের প্রকৃত অবস্থা গোপন করে তাকে সচ্ছল ও চারতলা বাড়ির মালিক বানানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালনকারী সেই ইউপি মেম্বার ও আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব আলীর শাস্তি দাবি করছেন হাজারো মানুষ। 
 
যে প্রশ্নটির উত্তর আসলে কারো কাছেই নেই, সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। তা হলো, আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও ফরিদ উদ্দিনের পরিবার যে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সেটি পূরণ করবে কে?

বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুস সালাম। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার শুরু সেই স্থানীয় ইউপি মেম্বারের অসত্য তথ্য দেওয়া থেকে। এর পরিসমাপ্তি ঘটেছে উপজেলা প্রশাসনের অতিমাত্রার অসতর্কতায়। 

তিনি বলছেন, ভুক্তভোগী ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে শুধুমাত্র কথা বলেই সদর উপজেলা প্রশাসনের শাস্তি নির্ধারণ করা উচিত হয়নি। পাশাপাশি শাস্তির মাত্রাটাও ছিল একটু বেশি। আর্থিক ক্ষতির পূরণ করা যাবে। কিন্তু পুরো পরিবার যে হেনস্তা আর মানসিক শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে তার রেশ কী করে কাটবে তা বলা মুশকিল। সেই মেম্বারকে আইনের আওতায় আনা উচিত। 

স্থানীয়রা বলছেন, যদি সত্যিকার অর্থেও ফরিদ উদ্দিন সচ্ছল ও চারতলা বাড়ীর মালিক হতেন, তাহলেও ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ ‘বাড়াবাড়ি’ ছিল। তাছাড়া শনিবার ঐ ত্রাণ দেয়ার সময় বা পরবর্তীতে যখন মিডিয়াতে বিষয়টি উন্মোচন হয়েছিল, প্রশাসনের উচিত ছিল তাৎক্ষনিকভাবে ঐ ব্যক্তির বাড়ি গিয়ে ভুল স্বীকার করা। ভুল স্বীকার করলে প্রশাসনের সম্মান কমতো না বরং সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনের সম্মান আরও বাড়তো। 

রোববার (২৩ মে) সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে কথা হয় সেই ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ দিতে গিয়ে বলেন, আপনারা না থাকলে, না আসলে আমি এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতাম না। আল্লাহ আপনাদের ভালো করুক। 

তিনি আরও বলেন, গোপনে খাবার চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই গোপন খবর আজ পুরো দেশের সামনে ওপেন হয়ে গেল। আর যেন কারো সঙ্গে এমন ঘটনা না ঘটে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেই ইউপি মেম্বার আইয়ুব আলী এখন নিজের দোষ ঢাকার চেষ্টায় আছেন। স্থানীয়দের নিয়ে তিনি ফরিদ উদ্দিনকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন তিনি অসত্য বলেননি। এমনকি ইউএনওকে তিনি খাদ্য বিতরণের নির্দেশ তুলে নিতে অনেক অনুরোধ করেছিলেন, এমনটিও যেন বলা হয় সেজন্য সবাইকে অনুরোধ করে বেড়াচ্ছেন। 

হটলাইন ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চাইলেও পাননি ফরিদ উদ্দিন। উল্টো গত বৃহস্পতিবার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে তাকে ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা দিতে হয়েছে। কেননা স্থানীয় ইউপি মেম্বার আইয়ুব আলী প্রশাসনকে জানিয়েছিল ফরিদ উদ্দিন ‘চারতলা বাড়ির মালিক এবং সচ্ছল’ ব্যক্তি। 

শনিবার ১০০জন দরিদ্র ত্রাণ নিতে এলে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে উঠে আসে অসুস্থ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ফরিদের আসল অবস্থা। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এলে শুরু হয় তোলপাড়।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ রোববার জানিয়েছেন, ফরিদ উদ্দিনের পরিবারের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। যদিও পূর্বে তিনি তার আর্থিক অবস্থার সঠিক তথ্য দেননি, তারপরও তাদের যে পরিমাণ খরচ হয়েছে, সে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টা উনার (ইউএনও)। তাই উনি কোনো না কোনো চ্যারিটেবল ফান্ড থেকে দিয়ে দেবেন। সবার আগে প্রয়োজন সেই অসহায় লোকটির পাশে দাঁড়ানো। 

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা রোববার বিকেলে জানিয়েছেন, আসলে গণমাধ্যমকর্মীদের কারণেই ফরিদ উদ্দিনের প্রকৃত চিত্রটি যাচাই করতে পেরেছি। তিনি প্রকৃতভাবে দরিদ্র। কিন্তু তিনি যদি সেদিন বিষয়গুলো, তার কথাগুলো বলতেন তাহলে এই সমস্যায় পড়তে হতো না। 

তিনি বলেন, স্থানীয় মেম্বার যেভাবে বলেছিলেন এবং ঐ দিন ফরিদ উদ্দিনের নিজের কথার কারণেই আমরা ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তার কথা বলেছিলাম। সোমবারের মধ্যে ফরিদ উদ্দিনকে তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়া হবে। 

কোন ফান্ড থেকে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও আরিফা জহুরা বলেন, আমি দেখছি। আমাদের উপজেলা প্রশাসনে বিভিন্ন চ্যারিটি ফান্ড রয়েছে, তাছাড়া স্থানীয় কোনো দানশীল ব্যক্তিও যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, দান করতে চান, সেভাবেও সাহায্য করা হবে।  

রাজু আহমেদ/আরএইচ

Link copied