নির্বাচনী হলফনামা দেখলে রাজনীতিবিদদের সততা ও প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুরের হলফনামায় উল্লেখিত বাৎসরিক আয় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী তার বাৎসরিক আয় ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা, যা মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার সমান। তার ঘোষিত আয় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনী হলফনামা সূত্রে জানা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সে তুলনায় নুরুল হক নুরের ঘোষিত আয় কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। নুর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দুপুরে পটুয়াখালী জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তার আয়ের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেন।
নুরুল হক নুর বলেন, নির্বাচনী হলফনামা দেখলে রাজনীতিবিদদের সততা ও প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়।
তারেক রহমানের আয় প্রসঙ্গে নুর বলেন, দেখেন তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তান। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই তার উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদের পরে তার আর ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় না তার ব্যক্তিগত প্রোপার্টি লাগবে, এমন কোনো চিন্তা থাকতে পারে। সেই জায়গা থেকে তিনি তো ভিন্ন বিষয় তার যদি প্রয়োজন হয় মানুষ ১ ঘণ্টার মধ্যে হাজার কোটি টাকাও তার পায়ের নিচে বিলিয়ে দেবে। কারণ মানুষ তাকে এতো ভালোবাসে। তার প্রতি মানুষের সেই আবেগ অনুভূতি আছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির সম্পর্কে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি বড় রাজনৈতিক দল। এই দলের যারা দলীয় প্রধান হয় বা যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আমার জানা মতে তাদের খরচ টরচ পার্টি থেকে অনেকখানি বহন করে।
অন্যান্য প্রার্থীদের হলফনামা সম্পর্কে নুর বলেন, অন্যান্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আমার যেটা মনে হচ্ছে, এগুলো যদি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয় তাহলে অনেকের তথ্যই গরমিল পাওয়া যাবে। আমার যতটুকু আছে, ততটুকুই সত্য।
নিজের আয়ের উৎস সম্পর্কে নুরুল হক নুর বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করেছি। ছাত্র থাকাকালীন সময়েও টিউশনি করিয়ে মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা ইনকাম করতাম। ১৮ সালে আমার পড়াশোনা শেষ হয়েছে। এরপর ১৯ সাল থেকে কাজ করছি। ১৯ থেকে এই ২৫ পর্যন্ত আমার একটা কর্ম আছে। যেটা আমার আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছি। আগস্টের পর থেকে টেলিভিশন খুললেই দেখবেন আমি টকশোতে। আমিতো দেখছি, টকশোতেও মাসে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা অনারিয়াম পাওয়া যায়। তারপর ছোটখাটো একটা বিজনেসের সাথে আমার ইনভলমেন্ট আছে। আমার আয়কর রিটার্নে লিখেছি আমার কোম্পানি একটা ডেভেলপার কোম্পানি, একটা কনসাল্টেন্সি ফার্মের সাথে যুক্ত আছে। আমার নিজস্ব একটা এগ্রিকাল সার্ভিস আছে। আমার নিজস্ব ব্যবসা থেকে বছরে আয় ২০ লাখ টাকা। এই ২০-৩০ লাখ টাকা যদি কারো আয় না থাকে তার তো নির্বাচনে আসা উচিত না। নির্বাচন তো আপনি মানুষের কাছ থেকে পয়সা পাতি এনে করবেন না। আর মানুষ দেবে এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন হয় না।
নির্বাচন কমিশনের বিধান নিয়ে নুর বলেন, নির্বাচন কমিশনে একটি বিধান (খরচের) আছে। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি কোনো প্রার্থী নির্ধারিত খরচের মধ্য থেকে নির্বাচন করতে পারে না। এটি সম্ভব নয়। আমরা বার বার বলে আসছি যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা একটা বড় পরিবর্তন চাই। কালো টাকা, পেশিশক্তি ও আধিপত্য বিস্তারের আমরা পরিবর্তন চাই। আমি কয় টাকা খরচ করব জানি না, আমার তো তেমন টাকা নাই। ২,৪,৫ কোটি টাকার নিচে কোনো জায়গায় নির্বাচন হয় না। আপনারা দেখেছেন যে, একজন প্রার্থী লিখেছেন ২০ ভরি স্বর্ণের মূল্য ২ লাখ টাকা। আচ্ছা আপনার বলেন ২০ ভরি স্বর্ণের বর্তমান মূল্য কত? একেকজন প্রার্থী যা লিখেছেন, একজন প্রার্থীও এটা খরচ করবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। সেক্ষেত্রে আমি বলব শুরু থেকেই প্রত্যেক প্রার্থীদের সততার পরিচয় দেওয়া উচিত। '
নির্বাচনী ব্যয় প্রসঙ্গে ভিপি নুর বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যয়ের সীমার মধ্যে থেকে বাস্তবে কেউই নির্বাচন করতে পারে না। এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। আমরা রাজনীতিতে কালো টাকা, পেশিশক্তি ও আধিপত্যের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। সততা দিয়ে রাজনীতি করাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন,“অনেক প্রার্থীর হলফনামা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করলে গরমিল পাওয়া যাবে। আমার যতটুকু আছে, আমি সেটুকুই সত্য হিসেবে দেখিয়েছি।
এর আগে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মনোনয়ন যাচাই-বাছাই সভায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মো. শহীদ হোসেন চৌধুরী নুরুল হক নুরের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। এই আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সদ্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। পটুয়াখালী-৩ আসনে প্রাথমিকভাবে মোট পাঁচজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
আরএআর