এলপি গ্যাস সংকটে দিশেহারা ডিলাররা, অনিশ্চয়তায় জীবিকা

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মজুত পর্যাপ্ত থাকার পরও বড় কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন ডিলার ও ব্যবসায়ীরা। নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এলপি গ্যাসের এই সংকট ডিলারদের জীবিকা অনিশ্চিত করে তুলেছে। একই সঙ্গে বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
সরবরাহ সংকটের সুযোগে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগে দেশের বিভিন্নস্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছে। কোথাও জেল-জরিমানাও করা হচ্ছে। তবে তাতেও বাজার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক এলপি গ্যাস বিক্রির ডিপো বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী দোকানপাট বন্ধ করে বাসায় বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
একদিকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না, অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান—এই দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন বিক্রেতারা। ফলে গ্যাস না থাকলেও আতঙ্কে দোকান খুলতে পারছেন না অনেক ব্যবসায়ী। সরবরাহ সংকট ও প্রশাসনিক অভিযানের মধ্যে পড়ে চরম দিশেহারা অবস্থায় দিন পার করছেন এলপি গ্যাস বিক্রেতারা।
সেনবাগ উপজেলায় বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাসের এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর রেজাউল করিম জুয়েল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে প্রতি মাসে গড়ে ৭ হাজার পিস গ্যাস সিলিন্ডার পেতাম। পুরো ডিসেম্বর মাসে পেয়েছি মাত্র ১ হাজার ৮৩৪ পিস। চলতি জানুয়ারিতে এখনো একটাও পাইনি। অথচ ব্যবসা বন্ধ থাকলেও খরচ একটুও কমেনি। গ্যাস না পেলেও কর্মচারীদের বেতন, গোডাউন ও অফিস ভাড়া, গাড়ির কিস্তি, ব্যাংক লোন—সবই আগের মতোই দিতে হচ্ছে। গ্যাস না পেলেই কি এই খরচ বন্ধ হয়ে যাবে?
তিনি আরও বলেন, আমরা কখনোই বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করতে চাই না। কিন্তু সরবরাহ না থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এলপি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে শুধু ডিলার নয়, এই খাতের সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর জীবন-জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
একই ধরনের সংকটের কথা জানান নোয়াখালী শহরের আরেক এলপি গ্যাস ডিলার মো. রায়হান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৩০০ পিস ধারণক্ষমতার ট্রাক পাঠিয়ে এখন ১০০ থেকে ১২০ পিস গ্যাস আনতে হচ্ছে। তাও অনেক দিন অপেক্ষার পর। এতে পরিবহন খরচ উঠে না, লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই সংকট অব্যাহত থাকলে থমকে যাবে ব্যবসা-বাণিজ্য। এটি শুধু একটি খাতের নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্যও অশনিসংকেত।
সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক ডিলার দোকানপাট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কর্মচারীরাও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
একজন গ্যাস ডিপোর শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাজ না থাকায় মালিক আমাদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন ক্ষেতের কাজ আর দিনমজুরি করে চলতে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট বাজারের গৃহিণী রেহানা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে নির্ধারিত দামেই গ্যাস পাওয়া যেত। এখন কোথাও গ্যাস নেই, আর যেখানে আছে সেখানে বেশি দাম চাইছে। রান্না চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।
একই অভিযোগ করেন বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল কালাম। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারি গ্যাসের টালবাহানা হয়। সারাদিন গ্যাস থাকেনা। আমাদের ভোগান্তির শেষ নাই। সিলিন্ডারের অতিরিক্ত দাম। আমরা অসহায় অবস্থায় আছি।
জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী এলপিজি গ্যাস বিক্রি করতে হবে। নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত কোনো অর্থ আদায় সম্পূর্ণ বেআইনি। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, কেউ যদি সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের তথ্য জেলা প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে জানাতে অনুরোধ জানান তিনি।
হাসিব আল আমিন/আরকে