নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে তিন মাসে ৫৭ শিশুর মৃত্যু, ভর্তি ৩৯৩৮

সারাদেশের মতো নোয়াখালীতেও শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ঠান্ডাজনিত রোগ। এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ঠান্ডা-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ভাইরাল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে অসংখ্য শিশু। এতে শিশুদের পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন তাদের অভিভাবকরাও।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে গত তিন মাসে (অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর) মোট ৫৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৩৯৩৮ জন শিশু।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মারা যাওয়া শিশুদের অধিকাংশই ঠান্ডাজনিত ও সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিল।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিনে হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে একটি শয্যায় দুই শিশুকে রাখতে হচ্ছে।
তৃতীয় তলার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি চার মাস বয়সী শিশু আলাউদ্দিন শিহাব। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা থেকে আসা শিশুটিকে নেবুলাইজেশন দেওয়া হচ্ছে। হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে চলছে স্যালাইন ও ইনজেকশন।
শিশুটির মা বিবি খাদিজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথমে রামগতির একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখান থেকে এখানে রেফার্ড করে। তিন দিন ধরে এখানে আছি, এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কিছুই নেই।
একই ওয়ার্ডে ভর্তি আড়াই বছর বয়সী শিশু মো. মামুন। তার মা সুফিয়া আক্তার বলেন, আমার ছেলের জন্ম থেকেই ঠান্ডাজনিত সমস্যা। সামান্য ঠান্ডা লাগলেই অসুস্থ হয়। এক মাসে দুইবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। গরিব মানুষের পক্ষে বারবার চিকিৎসা করানো খুব কষ্টের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসে (অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর) মাসে হাসপাতালে বিভিন্ন রোগে ৫৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়। যার মধ্যে অক্টোবর মাসে মারা যান ২৩ জন শিশু, নভেম্বর মাসে ১৬ জন শিশু ও ডিসেম্বর ১৮ জন শিশু। এদের অধিকাংশই ঠান্ডাজনিতসহ বিভিন্ন রোগে মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবর মাসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৩৭৬ জন শিশু, নভেম্বর মাসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৪৭৫ জন শিশু, ও ডিসেম্বর মাসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১০৮৩ জন শিশু। প্রতিদিন শিশু ওয়ার্ডে ৪০/৫০ জন ভর্তি হয় বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
জেলা শহরের বাসিন্দা আবদুল কাদের মাসুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডাক্তাররা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, তবে রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে সবাইকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিশু ওয়ার্ডে শয্যা ও নার্সের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। শিশু মৃত্যুর খবর আমাদের সবাইকে আতঙ্কিত করছে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে শিশু ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রোকেয়া বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিশু রোগীদের সেবা দিতে অনেক বেশি সময় ও মনোযোগ লাগে। কিন্তু আমাদের নার্স সংকট রয়েছে। কখনো একটি শিশু গুরুতর হলে একজন নার্সকে শুধু তার পেছনেই থাকতে হয়। এখানে আরও নার্স খুব প্রয়োজন।
শিশু বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. ইয়াকুব আলী মুন্সি ঢাকা পোস্টকে বলেন, শীত শুরু হওয়ার পর থেকেই শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আমরা ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছি। অধিকাংশ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। শিশু মৃত্যুর পেছনে শুধু শীত নয়, জন্মকালীন জটিলতা, সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, সেপসিস ও দুর্ঘটনাও দায়ী। তবে শীতকালে শিশুদের গরম কাপড় পরানো, ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে রাখা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে আনা খুব জরুরি।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, নোয়াখালী একটি জেলা হাসপাতাল হওয়ায় শুধু এ জেলার নয়, আশপাশের একাধিক জেলার রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে প্রতিদিন রোগীর চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে মানসম্মত সেবা দিতে বর্তমানে যে সংখ্যক ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে, তা একেবারেই অপ্রতুল। রোগীর চাপ সামাল দিতে এবং বিশেষ করে শিশু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দ্রুত আরও চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া জরুরি। তা না হলে চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
হাসিব আল আমিন/আরকে