‘ভোট না দেখা’ প্রজন্মে নির্ভর করছে তিন আসনের ফল

ফেনীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের সমীকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ছয় লাখ তরুণ ভোটার রয়েছেন, যাদের বড় অংশ কখনো কার্যকর জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখেনি। এ ভোটারদের ভূমিকাই এবার তিনটি আসনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা নির্বাচন অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী ফেনীতে এবার মোট ভোটার ১৩ লাখ ৩০ হাজার ৯২৪ জন। যা পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬৭ জন, মহিলা ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮ জন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারই ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই শ্রেণির মধ্যে কিছু সংখ্যক ভোটার ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করলেও এরপর কার্যত দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন না হওয়ায় ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেনি।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলায় মোট ভোটার ছিল ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ জন। এবার প্রায় এক লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় জেলায় ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা এনেছে।
একাধিক নতুন ভোটারের মতামত, নির্বাচন বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৃহৎ এ তরুণ ভোটারের মধ্যে রয়েছে জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট। নির্দিষ্ট কোন দলের প্রতি অন্ধ অনুকরণ না করে এ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশই ভোট দিতে পারে ‘ব্যক্তিকে’। অর্থাৎ, তরুণ ভোটাররাই নির্ধারণ করবে কারা আগামীর জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না থাকলেও বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী আলাদা জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিজেদের পক্ষে টানতে একাধিক প্রার্থীর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনীর তিনটি আসনে বিএনপির প্রার্থী থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ফেনী সদর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। আসনটি বিএনপির ভোট ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত হলেও নতুন ভোটার এবং জুলাই স্পিরিটের কারণে মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন তিনি। তবে সদরে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জয়নাল আবেদিন (ভিপি জয়নাল) দলীয় ভোট ব্যাংকের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের কারণে জনপদে আলোচিত। এছাড়া ফেনী-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রফিকুল আলম মজনুর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন। ফেনী-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলীয় প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিপরীতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক।
শহীদুল ইমরান নামে এক আইনজীবী বলেন, ফেনীতে এবার ভোটের সমীকরণ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। এর অন্যতম কারণ জেন-জি প্রজন্ম। তরুণ এই বড় জনগোষ্ঠীর ভোটার যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তবে যেকোনো দলের জয়-পরাজয় নির্ধারণে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোও এখন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে নানামুখী কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে, তাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে আগামীর নির্বাচনী রণকৌশল।
বয়সভিত্তিক ভোটারের চিত্র
নির্বাচন অফিসের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলায় ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৭৯ হাজার ৮৮২ জন, ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩৪ জন, ২৬ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটার ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৬৮ জন, ৩০ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৮০১ জন ও ৩৪ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৫ জন।
৩৮ থেকে ৪১ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৮৩ জন, ৪২ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৬১ জন, ৪৬ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ৯৫ হাজার ৫৬৮জন, ৫০ থেকে ৫৩ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৯০৩ জন, ৫৪ থেকে ৫৭ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ৬৭ হাজার ২২৯ জন, ৫৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ৫৪ হাজার ৩২২ জন এবং ষাটোর্ধ্ব বয়সী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৩১ জন।
এই বয়সভিত্তিক ভোটারদের বড় অংশের জন্ম ১৯৯০ সাল ও তার পরে। ফলে তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রায় দেখেনি। ২০১৪ সালে বিনাভোটে নির্বাচন, ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোটের’ অভিযোগ আর ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া এই প্রজন্মের কাছে ভোটাধিকার এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
যেমন ছিল বিএনপি-জামায়াতের ভোটের ফলাফল
এদিকে সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পৈত্রিক ভূমি হওয়ায় এ জেলায় ভোটের মাঠে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে এমন তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ২০০১ সাল থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপি জোটবদ্ধ নির্বাচন করেছে। সেক্ষেত্রে এবার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচন করাতে তাদের ভোট ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। অধিকন্তু নতুন ও তরুণ ভোটার হয়ে উঠতে পারে ফলাফল নির্ধারণী চলক।
জেলার বিগত সময়ের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে নির্বাচন করেছে। ১৯৯১ সালে ফেনী-১ আসনে জামায়াতের ভোট ছিল শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ, ফেনী-২ আসনে ২০ দশমিক ১৩ শতাংশ ও ফেনী-৩ আসনে ১৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে ফেনী-১ আসনে জামায়াতের ভোট ছিল ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, ফেনী-২ আসনে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ফেনী-৩ আসনে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ফেনী-১ আসনে জামায়াতের গড় ভোট ৩ দশমিক ৯৭ ভোট, ফেনী-২ আসনে ১৩ দশমিক ৯৬ ভোট এবং ফেনী-৩ আসনে গড় ভোট ১০ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ, পরপর এই দুই জাতীয় নির্বাচনে ফেনীতে জামায়াতে ইসলামীর গড় ভোট ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০০১ সাল ও ২০০৮ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধ নির্বাচন করায় এ দুই নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হয়নি।
একইভাবে ১৯৯১ সালে ফেনী-১ আসনে বিএনপির ভোট ছিল ৩৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, ফেনী-২ আসনে ৩২ দশমিক ৯১ শতাংশ ও ফেনী-৩ আসনে ৪৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে ফেনী-১ আসনে বিএনপির ভোট ছিল ৫৪ দশমিক ৮২ শতাংশ, ফেনী-২ আসনে ৪০ দশমিক ৮৮ শতাংশ ও ফেনী-৩ আসনে ৫১ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ফেনী-১ আসনে বিএনপির গড় ভোট ছিল ৪৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ফেনী-২ আসনে গড় ভোট ৩৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও ফেনী-৩ আসনে গড় ভোট ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এই দুই নির্বাচনে ফেনীতে বিএনপির গড় ভোট ছিল ৪৪ দশমিক ০৯ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর গড় ভোটের হিসাব-নিকাশ এবারের নির্বাচনে একইরকম নাও হতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ফেনীতে ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশ তরুণ ভোটারদের বাদ দিলে বাকি ভোট রয়েছে ৫৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।
আরকে