বরিশালে নারী ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশালে ভোটের সমীকরণে বড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন নারী ভোটাররা। বিভাগের ছয়টি জেলায় ২১টি সংসদীয় আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় পুরুষ ভোটারের সমান হওয়ায় প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের হিসাব এখন অনেকটাই নির্ভর করছে তাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
এ অবস্থায় বড় ও ছোট সব দলের প্রার্থীরাই নারী ভোটারদের মন জয় করতে নানা প্রতিশ্রুতি ও কৌশলী প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। উঠান বৈঠক, নারী কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার প্রবণতা এবার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৭৪ লাখ ২৩ হাজার ৫২২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ৩৬ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৭ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক।
অপরদিকে, বিভাগের ২১টি আসনে বিভিন্ন দল ও জোটের হয়ে মোট ১২৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন মাত্র দুইজন।
এই দুই নারী প্রার্থীর একজন বরিশাল-৫ (সিটি করপোরেশন–সদর উপজেলা) আসনে বাসদ মনোনীত মই প্রতীকের প্রার্থী ডা. মনিষা চক্রবর্তী। অপরজন ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো।
নারী প্রতিনিধিত্বের স্বল্পতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, “আমাদের দেশে এত বড় গণআন্দোলনের পরও নারীদের পিছিয়ে রাখার যে মানসিকতা রয়ে গেছে, তা আগামীর জন্য শুভ নয়। এতে নারীরা রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত হবেন এবং সংসদে নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জায়গা আরও সংকুচিত হবে।”
নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছে। ফলে নির্বাচনী মাঠে নারী ভোটাররা এখন ‘নির্ধারক শক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। সচেতন নারী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণে বদলাচ্ছে ভোটের ধারা।
এদিকে নারী ভোটারদের ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ মুফতী ফয়জুল করীমের হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রচারণাকালে তারা নারীদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নৈতিক সমাজ গঠনে হাতপাখা প্রতীকের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। বিষয়টি নিয়ে বরিশালে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রচারণায় অংশ নেওয়া নারী কর্মীরা বলেন, “নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় হাতপাখাই সবচেয়ে যোগ্য প্রতীক। আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি।”
অন্যদিকে, বাসদ মনোনীত নারী প্রার্থী ডা. মনিষা চক্রবর্তী বলেন, “একদিকে নারী নির্যাতন বাড়ছে, অন্যদিকে নারী বিদ্বেষী একটি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আমরা দেখছি, কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন- ক্ষমতায় এলে নারীদের চাকরি করার প্রয়োজন হবে না। এমন বক্তব্য যে সমাজে শোনা যায়, সেখানে নারীরা রাজনীতিতে এগিয়ে আসবে কীভাবে?”
নারী ভোটারদের ভাবনার পরিবর্তনের কথাও উঠে আসছে মাঠপর্যায়ে। বরিশাল নগরের কাউনিয়া এলাকার গৃহিণী শাহিদা বেগম (৩৮) বলেন, “আগে রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবতাম না। এখন বাজারদর, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, সবকিছুর সঙ্গেই রাজনীতি জড়িত। যিনি এসব সমস্যার সমাধানের কথা বলবেন, তাকেই ভোট দেব।”
বরিশাল-৩ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, “এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের সমর্থন ছাড়া জয় পাওয়া কঠিন। তারা এখন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কারও ওপর নির্ভর করছেন না। আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৩১ দফায় নারীদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।”
উন্নয়নকর্মী শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো জরুরি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষক অধ্যাপক শাহে আলম বলেন, “বরিশালে নারী ভোটাররা এখন ‘সুইং ভোটার’ এ পরিণত হয়েছেন। শেষ মুহূর্তে তারা যেদিকে ঝুঁকবেন, ফলাফল সেদিকেই যাবে। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।”
বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, নারী ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি কেন্দ্রে নারী ভোটারদের জন্য আলাদা বুথ, নারী পুলিশ সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বরিশালের নির্বাচনী বাস্তবতায় নারী ভোটাররা আর নীরব দর্শক নন। উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও জীবনমান-এই তিন বিষয়ের ভিত্তিতে তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কোন প্রার্থী হাসবেন শেষ হাসি।
উল্লেখ্য, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৭৪ লাখ ২৩ হাজার ৫২২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ৩৬ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৭ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। বরিশাল জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৪৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১১ লাখের বেশি।
আরকে