প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে নয় ভেবেচিন্তে, ভোট দিতে চান ভোটাররা

ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। ভোটের বাকি আর মাত্র ১৩ দিন।
দরজায় কড়া নাড়া ভোট ঘিরে রংপুরে বাড়ছে প্রচার-প্রচারণা। মাঘের হালকা শীতেও সরগরম নির্বানী মাঠ। দিন-রাত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে প্রার্থীরা ছুটছেন শহরে-গ্রামে। করছেন সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠকসহ মিটিং-মিছিল। প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন এ নির্বাচনে সাড়া ফেলেছে বিভিন্ন দলের নির্বাচনী থিম সং। সঙ্গে ছন্দে আনন্দে গানের সাথে মাইকিং আর ডিজিটাল প্রচার-প্রচারণায় যেন ফিরেছে ভোটের বসন্ত।
রংপুর জেলার ছয়টি আসনের সবগুলোতে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। আসন সমঝোতার কারণে একটিতে এনসিপিকে সমর্থন দিয়ে বাকি পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রার্থী দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে এলাকায় নানাভাবে গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
এ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মাকর্সবাদী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও সক্রিয় রয়েছেন প্রচার-প্রচারণায়। কোথাও কোথাও প্রার্থীদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকাসহ আটটি উপজেলা নিয়ে সংসদীয় আসন ৬টি। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে আলোচনায় ছিল রংপুর। কারণ এ জেলা থেকে নির্বাচিতদের অনেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশের। অধিষ্টিত হয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আসনেও। এবার জেলার ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৪ জন প্রার্থী। এ নির্বাচনে রংপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে দেখছেন ভোটাররা। তাদেরকে ঘিরে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
এছাড়াও রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘হরিণ’ প্রতীকে নির্বাচনে লড়ছেন তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী। আনোয়ারা ইসলাম রানী রংপুরের ন্যায় অধিকার ট্রান্সজেন্ডার উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও উন্নয়নে কাজ করে আসছেন।
এর আগে ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আনোয়ারা ইসলামী। ওই নির্বাচনে ঈগল প্রতীক নিয়ে তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়েছিলেন।
এদিকে, প্রচার-প্রচারণার মাঠে প্রার্থীরা উন্নয়নের নানা আশ্বাস দিলেও ভেবে চিন্তে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকেই বেছে নেওয়ার কথা বলছেন জেলার নবীন-প্রবীণ ভোটারেরা। তবে সহিংসতামুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা সবারই। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ও পরে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখবে বলে মনে করছেন সচেতন ভোটাররা।
বিগত তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগে বঞ্চিত মানুষের সাথে এবার নতুন ও তরুণ ভোটাররাও ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। তাদের দাবি, ভোটারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে অতীতের মতো বিতর্ক পিছু ছাড়বে না। শুধু নিরাপত্তাই নয় অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ভূমিকা পালনের আহ্বান তাদের।
প্রতীক বরাদ্দের পর এখন পর্যন্ত নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে খুশি সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের অনার্সপড়ুয়া শিক্ষার্থী কানিজ ফারিহা। রংপুর-৩ আসনের নতুন এই ভোটার তার প্রত্যাশা প্রসঙ্গে বলেন, আমার সব থেকে বড় প্রত্যাশা আমি যেনো নির্ভয়ে কারচুপিমুক্ত সুষ্ঠু পরিবেশে আমার ভোটটি আমি দিতে পারি। আমাকে যেনো শুনতে না হয় আমি ভোট দেয়ার আগে আমার ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে গেছে।
রংপুর-২ আসনের ভোটার ও অধিকার কর্মী সেলিম সরকার বলেন, আমার ভোটে এমন কাউকে নির্বাচিত করতে চাই যিনি সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনবে। আমরা যে দুর্নীতিমুক্ত আগামীর সুস্থ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তা বাস্তবায়নে কাজ করবে। এমন একজন জনপ্রতিনিধিকে সংসদে দেখতে চাই, যার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি উন্নয়ন হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দাবি
নগরীর জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা জাকিয়া আক্তার জিম বলেন, আমাদের শহরটা খুবই ছোট এবং অবহেলিত। এই অবহেলিত শহরের হাল ধরতে পারবে এমন একজনকে এমপি হিসাবে সংসদে দেখতে চাই। যে আমাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে কাজ করবে। যার হাত ধরে আমাদের রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। কলকারখানা গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে। আমরা বাজেটে অবহেলিত থাকব না।
আব্দুল্লাহ-আল মামুন রংপুর-৫ আসনের ভোটার। তার কাছে এই নির্বাচন রংপুরের মানুষের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পেশায় ব্যবসায়ী এই যুবক বলেন, আমাদের জেলা সবসময় অবহেলিত। এত নেতা তবুও কোনো উন্নয়ন হয়নি। এ জেলায় কোনো শিল্পকলকারখানা, বাণিজ্যিক পোর্ট, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল-ইপিজেড নেই। অথচ যেকোনো আন্দোলনে রংপুরের মানুষ সবার আগে জীবন দেয়। আর ফলপ্রাপ্তির বেলায় রংপুর একবারেই শূন্য।
রংপুরের কাঙ্খিত উন্নয়নে যোগ্য প্রার্থীকে ভোটটি দেয়ার আহ্বান তিস্তাপাড়ের আমিনুল ইসলামের। রংপুর-৪ আসনের এই ভোটার বলেন, কেউ তিস্তার পানি আনতে পারে নাই। সবাই শুধু তিস্তা নিয়ে রাজনীতি করছে। আমরা এবার চিন্তা-ভাবনা করে ভোট দিতে চাই। যাতে করে এলাকার উন্নয়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
এদিকে, রংপুর-৩ (সদর ও আংশিক সিটি) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রাণী বলেন, আমি রংপুরের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে সংসদে গিয়ে তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলতে চাই।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা) আসনের প্রার্থী আখতার হোসেন বলেন, আমরা স্বচ্ছতার রাজনীতি চাই। যার যেটা ন্যায্য হক, তার কাছে সেটা পৌঁছাতে চাই। আমরা ক্ষমতায় গেলে পিছিয়ে পড়া রংপুরকে নিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ) আসনের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়। অতীতে যা কিছু দেখেছে তার মধ্যে কল্যাণ ছিল না। একটা কল্যাণকর জনবান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফিরতে এবার জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবে না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের সত্য ও ন্যায়ের যে ভূমিধ্বস জয় দেখেছে মানুষ। তার এখন সারা দেখতে চায়। একারণে সবখানে পরিবর্তনের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, ১২ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ার যাত্রা শুরু হবে।
রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ (সদর ও আংশিক সিটি) আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু বলেন, রংপুরের মানুষ এবার আবেগ নয় বিবেকের বিজয় ঘটাতে প্রস্তুত। একটা নেতা ও প্রতীকের প্রতি আগে যে আবেগ বিশ্বাস ছিল, তা এখন আর নেই। কারণ ওই নেতার দলের কারণেই রংপুর পিছিয়ে গেছে। মানুষ এখন সচেতন। ধানের শীষকে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের হাত ধরে রংপুরের কাঙ্খিত উন্নয়ন হবে ইনশাআল্লাহ্।
এই নির্বাচনে ছয়টি আসনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৭ জন এবং স্বতন্ত্র ৭ জন প্রার্থীসহ মোট ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, বর্তমানে রংপুর জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছে ৩১ জন। জেলায় মোট ৮৭৩টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।