বাংলার মাটিতে আর কোনো নারীর অসম্মান দেখতে চাই না

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, এই বাংলার মাটিতে আর কোনো নারীর অসম্মান আমরা দেখতে চাই না। আমাদের কোনো নারী কর্মীর গায়ে কেউ হাত তোলার দুঃসাহস দেখাবেন না।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা সদরের মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি (এমএন একাডেমি) মাঠে ফরিদপুর-২(নগরকান্দা-সালথা উপজেলা) আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী শাহ আকরাম আলীর পক্ষে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টার দিকে তিনি বক্তব্য দেন।
স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্দেশ করে মামুনুল হক বলেন, আপনারা আল্লামা আকরাম আলীকে সোজা-শান্ত মানুষ মনে করেছেন। বুজুর্গ মানুষ দেখে নরম ভেবেছেন। হ্যাঁ, উনি সাদাসিধা মানুষ—এ ভেবে যদি তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করেন, তাহলে জনতার কাঠগড়ায় আপনাদের পাই পাই করে মূল্য দিতে হবে। বারবার এখান থেকে খবর যায় আমার কাছে— আমরা এই নগরকান্দা-সালথার কর্মীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত। আমাদের কর্মীদেরকে, ভোটারদেরকে ভয় প্রদর্শন করা হয়, ভীতি প্রদর্শন করা হয়। প্রশাসনের কাছে নালিশ দিলে উনারা মুচকি মুচকি হাসেন। আপনারা এই এমএন একাডেমির মাঠ আমাদেরকে বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে অনেক গড়িমসি করেছেন। শেষ পর্যন্ত আমাকে কেন্দ্র থেকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আজকের পর থেকে বলে দিতে চাই— আপনারা যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে না পারেন, এর সমস্ত দায়-দায়িত্ব ফরিদপুরের ডিসির, নগরকান্দা-সালথার প্রশাসনকে নিতে হবে।
তিনি বলেন, ১১টি দল দেশকে ভালোবেসে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিগত ৫৪ বছরের গুন্ডামি আর দুর্নীতির রাজনীতির বিরুদ্ধে জনতার অধিকার আদায় করার মহান লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের এই মহান যাত্রা, আমাদের এই হাতে হাত রেখে এই ঐক্য গঠন কোনো নেতা, কোনো দল বা কোনো জোটকে ক্ষমতায় নেওয়ার জন্য শুধু নয়। আমাদের এই ঐক্য বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। আপনাদের এই ফরিদপুরে হাজী শরীয়তুল্লাহ, মোহন মিয়াসহ ওই সময়ের নেতারা এই অঞ্চলের আধিপত্যবাদকে রুখে দেওয়ার জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। আধিপত্যবাদী কলকাতার দাদাবাবুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। তারপরে পশ্চিম পাকিস্তানি খান-পাঠানদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে।
মামুনুল হক বলেন,একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমার বাংলাদেশে যখন স্বাধীন হলো, তখন দেশের সাত কোটি মানুষ আশায় বুক বেঁধে ছিল—এখন আমার দেশের মানুষ আমাদের শাসন করবে, শাসনের নামে শোষণ করবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য—এদেশের মানুষের একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ এর আগস্ট পর্যন্ত এদেশের মানুষ ক্ষমতায় বসে শাসনের নামে শোষণ করেছে, জুলুম করেছে। একাত্তরের স্বাধীনতার পর থেকে ২৪ পর্যন্ত এদেশের মানুষ স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী দ্বারা শোষিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে আবার সেই আধিপত্যবাদী শক্তি, সন্ত্রাসবাদ, জুলুমবাদ, স্বৈরতন্ত্র, পেশিশক্তি, হেলমেট বাহিনী, হাতুড়ি বাহিনী—আবার তারা বাংলাদেশের মানুষকে ভয় দেখানোর রাজনীতি শুরু করেছে বলে অভিযোগ তিনি।
তিনি বলেন, তারা আমাদের নিরীহ সাধারণ জনতাকে হুমকি-ধমকি দেয়। অনেকে বলে যদি অমুক মার্কায় ভোট না দাও, আগামী দিনে নাকি ঘর থেকে বের হতে দেবে না। তারা বলে তোমরা যদি রিকশা মার্কায় ভোট দাও, আমার নিরীহ নিপীড়িত নগরকান্দা-সালথার জনগণকে বলে তাদের ঘর থেকে বের হতে দেবে না। পরিষ্কার ভাষায় শুনে রাখো—শাহ আকরাম আলী নগরকান্দা সালথায় ভাড়াটিয়া থাকে না। তার একজন নেতাকর্মীর গায়ে যদি হাত দেওয়া হয়, তোমরা সেই আগুন সামাল দিতে পারবে না। গোটা বাংলাদেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।
মামুনুল হক বলেন, জুলাই বিপ্লব এ দেশে প্রমাণ করে দিয়েছে—বিপ্লবের জন্য বড় দল লাগে না, বিপ্লবের জন্য বড় নেতার প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, যদি কেউ আবার তাদের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়, তাদের পরিণামও তাই হবে—তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম যা হয়েছিল।
মামুনুল হক কারও নাম উল্লেখ না করে ওই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদকে উদ্দেশ করে বলেন, এই এলাকায় আমাদের অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র একজন মরহুম জাতীয় নেতার সন্তান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আপনাকে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও প্রতিযোগিতায় স্বাগত জানাই এবং আপনার বাবাকে শ্রদ্ধা জানাই। মনে রাইখেন—আপনি যার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন, উনি আপনার বাবার বয়সী। যদি আপনি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করতে পারেন, তাহলে পাস করলেও অনেক হিসাব করে আপনাকে সংসদে ঢুকতে হবে। কাজেই সম্মান জানান, সম্মান পাবেন, শ্রদ্ধা জানান, প্রতি-উত্তর পাবেন। কেউ ভালোবাসা দিলে আমরা ভালোবাসা দেই, কিন্তু কেউ যদি আমাদের পথে কাঁটা বিছিয়ে দেয়, সেই কাঁটা উপড়ে ফেলার সক্ষমতা আমাদের আছে। আমরা ১১ দলীয় জোটের এগারো ভাই হাতে হাত রেখেছি। এবার বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার ফসল ঘরে তুলে দিয়েই আমাদের লড়াই ক্ষান্ত হবে।
তিনি বলেন, আমার মা, বোন, কন্যাদের বলি—আপনারা নির্বিঘ্নে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করবেন। মা-বোনদের কাছে ঘরে ঘরে আমাদের প্রতীকের দাওয়াত নিয়ে আপনারা যাবেন। আর অন্যদেরকে বলি— এই বাংলার মাটিতে আর কোনও নারীর অসম্মান আমরা দেখতে চাই না। আমাদের কোনও নারী কর্মীর গায়ে কেউ হাত তোলার দুঃসাহস দেখাবেন না। অনেকগুলো দুঃখজনক ঘটনা কিন্তু ঘটে গেছে। আমাদের পিঠ কিন্তু দেয়ালে ঠেকে গেছে। এরপরে যদি আমরা রিয়াকশন শুরু করি, পালাবার পথ খুঁজে পাবেন না। অন্য দলের হলেও সমস্ত নারীদের প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা বজায় রেখে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। যে জাতি মায়ের জাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারে না, সে জাতি পৃথিবীতে সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে না। আমরা পরিষ্কারভাবে বলি—আমরা শান্তির বাংলাদেশ চাই, সমৃদ্ধির বাংলাদেশ চাই। নতুন করে কোনো ফ্যাসিবাদ আমরা বাংলার মসনদে দেখতে চাই না।
জহির হোসেন/আরএআর