নোয়াখালী-৬ আসনে জমে উঠেছে ভোটের লড়াই

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে ভোটের মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ব্যক্তি জনপ্রিয়তা, দলীয় প্রভাব এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের উপস্থিতিতে এ আসনে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক ও আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বিএনপির প্রার্থীর।
দলীয় নেতা-কর্মীদের মতে, ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কারণে এ আসনে বিএনপির ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হচ্ছে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন এনসিপির প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ।
জানা গেছে, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে এবারের নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাত পাখা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম শরীফ, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এটিএম নবী উল্যাহ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) মনোনীত তারা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মোতালেব, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির একতারা প্রতীকের প্রার্থী আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আব্দুল মালেক, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ছাতা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হোসেন, ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর উদ্দিন রাজীব এবং হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম।
১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ৩১০ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮৪ জন।
এ আসনে মোট ১০৪টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে, যার একটিও অস্থায়ী নয়। তবে ৬৬৫টি ভোটকক্ষের মধ্যে ৬৮টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ রয়েছে।
সারা দেশে যেখানে দলীয় পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে, সেখানে হাতিয়ায় এখনও ব্যক্তি গুরুত্ব পায় বেশি। এখানকার ভোটাররা প্রতীক নয়, বরং প্রার্থী অর্থাৎ ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও অতীত ভূমিকা বিবেচনা করেই ভোট দেন।
নদীভাঙন রোধ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, স্বাস্থ্যসেবা ও বাসস্থান সমস্যার কার্যকর সমাধান—ভোটারদের মতে, যিনি এসব ক্ষেত্রে বাস্তব ও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারবেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত সংসদে যাওয়ার যোগ্য হবেন। ফলে নোয়াখালী-৬ আসনে এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় লড়াই নয়, বরং ব্যক্তি ও কর্মদক্ষতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এবার এ আসনে বিএনপির নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় এসেছেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাহবুবের রহমান শামীম। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী, জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ। মাঠপর্যায়ে তার সাংগঠনিক তৎপরতা এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত দেড় বছরে নদীভাঙন রোধসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখে তিনি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন তানভীর উদ্দিন রাজীব (ফুটবল প্রতীক) ও মোহাম্মদ ফজলুল আজিম (হরিণ প্রতীক)। বিশেষ করে মোহাম্মদ ফজলুল আজিম এ আসনে ‘চমক’ দেখাতে পারেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তরুণ প্রার্থী তানভীর উদ্দিন রাজীব নবীন হলেও দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তরুণ ভোটারদের একটি অংশ তার দিকে ঝুঁকছে। অপরদিকে অভিজ্ঞতার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন মোহাম্মদ ফজলুল আজিম, যাকে মানুষ প্রতীক নয়, ব্যক্তি হিসেবেই ভালোবাসে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
মোহাম্মদ ফজলুল আজিম নোয়াখালী-৬ আসনের পরিচিত মুখ। তিনি ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে, ২০০৮ সালে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবং ২০১৮ সালে পুনরায় বিএনপি থেকে—মোট তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। হাতিয়ার উন্নয়নে নদীভাঙন রোধ, সড়ক নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে তার ভূমিকা স্থানীয়দের কাছে অনস্বীকার্য।
বিএনপির প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিএনপি আগামী দিনে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে হাতিয়ার এক ইঞ্চি জমিও নদীগর্ভে বিলীন হতে দেওয়া হবে না। ব্লকবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ করা হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হবে। পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে হাতিয়াকে একটি আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে এবং নিঝুমদ্বীপ হবে বাংলাদেশের ‘মালদ্বীপ’। হাতিয়ার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই আসনটি আমরা আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের হাতে উপহার দিতে চাই।
১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাতিয়ার জন্য আমি যা করেছি, তা আমার দায়বদ্ধতার তুলনায় খুবই সামান্য। আমরা গোলামী নয়, আজাদ হয়ে বাঁচতে চাই; শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে চাই। একটি উন্নত, আধুনিক ও নিরাপদ হাতিয়া বিনির্মাণে ১০ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঐক্য হাতিয়ার মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমি কাজ করে যেতে চাই।
স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর উদ্দিন রাজীব ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত ১৭ বছর ধরে আমি এই হাতিয়াতেই ছিলাম। ৫ আগস্টের পর অনেক নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে, তবে দলীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে আমাদের বহু ত্যাগ ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। হাতিয়ার মানুষ উন্নয়ন চায়। একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমি চাই একটি পরিকল্পিত, টেকসই ও ভবিষ্যতবান্ধব হাতিয়া গড়ে তুলতে।
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি তিনবারের সংসদ সদস্য হিসেবে হাতিয়ায় দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করেছি। দীর্ঘ চার দশক ধরে হাতিয়ার মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। জীবনের শেষ সময়েও আমি হাতিয়ার মানুষের পাশে থাকতে চাই। ২০০৮ সালে দলীয় প্রতীক ছাড়াই আমি একমাত্র স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। এবারও ‘হরিণ’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। মানুষের ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ তারা ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই দেবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে নোয়াখালী জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৯৭৯ জন এবং পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪৮ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ১৪ জন। জেলায় মোট ৮৭৫টি কেন্দ্রে ৫ হাজার ৬০৯টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি রয়েছে।